মধ্যপ্রাচ্যে ফের শুরু হয়েছে যুদ্ধের উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম।
যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় একদিকে বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে লাফিয়ে বাড়ছে সরকারের লোকসানের বোঝা। চলতি অর্থবছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের যে হিসাব ধরা হয়েছিল, যুদ্ধের প্রভাবে তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এদিকে ইন্দোনেশিয়া কয়লা কমিয়েছে। এ কারণ কয়লা দাম ও পরিবহণ ব্যয় বাড়েছে; ফলে বিদুৎ উৎপাদনের উপর প্রভাব পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর একই কারণে বাড়তি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি করে গত ৬ মাসে পেট্রোবাংলা লোকসান দিয়েছে ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু তেল এবং গ্যাস খাতে লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাস ধরলে এই লোকসান আরও বাড়বে।
অপর দিকে বাড়তি দামে কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল কিনতে গিয়ে অনেকটা দেউলিয়া হওয়ার দশা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। বিদ্যুৎ বিভাগের এই সংস্থা জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেই লোকসান গিয়ে ঠেকবে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বাংলাদেশকে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে। তবে এ কথাও সত্য যে, সরকারের প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা ও কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে সংকট নিরসনে সরকার সাধ্যমতো সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ সামনের দিকে বেগবান না হলে দু’সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারে।
এদিকে গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ উত্তপ্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও হুহু করে বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ব্র্যান্ড ত্রুদ্ধডের দাম ৯৬ দশমিক ৬৩ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হলে এই দাম আরও বাড়বে। এর মানে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সামনে আরও বিপদ হাতছানি দিচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি করে। পিডিবি জানিয়েছে, গত বছর ইন্দোনেশিয়া কয়লা উত্তোলন ২৫ শতাংশ কমিয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। তাই প্রতি টন কয়লা এখন ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলার পর্যন্ত ঠেকেছে। এ কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম আগের চেয়ে বাড়বে।
পিডিবির একাধিক কর্মকর্তারা জানান, গত জুনে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপর ধারণা করা হয়, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান আগের চেয়ে কমবে। কিন্তু সেই লোকসান এখন আরও বাড়তে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে সম্প্রতি সরকার ফার্নেস অয়েল দিয়ে চার হাজার মোগওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বৃহস্পতিবার বলেন, বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দেশের জনগণ এবং সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লেও আগামী কয়েক মাস বেশি দামে তেল এবং এলএনজি কিনে শিল্প কারখানা চালু রাখতে হবে। তবে শীতকালে কিছুটা লোডশেডিং দিয়ে সেই অর্থ সাশ্রয় করতে পারে সরকার। এ ব্যাপারে জনগণের সহায়তা দরকার।
সূত্র: যুগান্তর







