জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন নিশ্চিতের দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করায় ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছে ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।
মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে দফায় দফায় এই হামলার ঘটনা ঘটে৷ এই হামলার নেপথ্যে কারণ হিসেবে ২য় ক্যাম্পাসের টেন্ডার ভাগাভাগিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা৷
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, এদিন জবির কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত জুলাই প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান ড. মামুন আহমেদ। অনুষ্ঠানে ২য় ক্যাম্পাস সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন নিশ্চিতকরণসহ ও মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নের দাবিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন ইনকিলা মঞ্চ ও জকসু নেতৃবৃন্দরা৷ এসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রদল বাঁধা দেয়৷ ছাত্রদলের পক্ষ থেকে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করা হয়।
জানা যায়, কেরানিগঞ্জে জবির নিজস্ব ৭ একর জমিতে ১৭০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার৷ সেখানে অস্থায়ী আবাসনের বদলে ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য ১০ তলা ভবন তৈরির উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের বদলে স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ, শিবির, ছাত্রশক্তি ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।
এরই প্রেক্ষিতে সম্মিলিত প্রতিবাদ জানাতে আজ মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে উপস্থিত হন শিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা৷ এসময় প্রোগ্রামস্থলে প্রবেশ করতে চাইলে জকসু ভিপি ও ইনকিলাব মঞ্চ নেতাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন জবি প্রক্টর ও ছাত্রদল। পরে তারা কিছুদূর সরে গিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নিয়ে শ্লোগান দিতে থাকেন৷ এসময় প্রক্টর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এসে ভিপি রিয়াজুল ইসলামকে বলেন, তোমরা এখান থেকে না উঠলে সীন ক্রিয়েট করে ছাত্রদল দিয়ে হামলা করানো হবে৷ তখন ভিপি রিয়াজুল ইসলাম অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন৷ এরপরই ছাত্রদলের নেতৃত্বে একযোগে শিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের ওপর হামলা শুরু হয়।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় ২য় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তরের বিরোধীতা করে আসছে জবি শাখা ছাত্রদল৷ একটি বেসরকারি টেলিভিশনে টকশোতে ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন সেনাবাহিনীকে কাজ হস্তান্তরের প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্যও দিয়েছিলেন। বর্তমান ২য় ক্যাম্পাসের প্রথম ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর অধীনে চলমান রয়েছে৷ তবে ২য় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়ার বিরোধীতা করছে জবি প্রশাসন ও ছাত্রদল। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেকদের একটি সুসংগঠিত চক্র টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে তৎপর রয়েছে। অপরদিকে ২০ কোটি টাকার আবাসিক হল নির্মাণের কাজ ছাত্রদলের এক নেতাকে দেয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন ও ছাত্রদল৷
এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের টেন্ডার ভাগাভাগির সহযোগী হিসেবে রয়েছে পুরান প্রভাবশালী বিএনপি নেতারা৷ এসব নেতাদের ইশারায় কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল ও স্থানীয় যুবদলের নেতাকর্মীরা সুসংগঠিতভাবে হামলা করেছে বলে জানা যায়।
ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় নেতা ও জবি শিক্ষার্থী জাবির খান বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা প্লাকার্ড প্রদর্শন করতে গেলে ছাত্রদল বাধা দেয়। তারা যখন বাইরে এটা নিয়ে বসে থাকাদের ওপর নগ্ন ও অতর্কিত হামলা চালায়। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এটা চাই নাই। টোকাই বাহীনী নিয়ে ইমার্জেন্সির ভেতরে ঢুকে মারছে। আহত চিকিতসাও নিতে দেয়নি তারা।
জবি ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিব বলেন, ক্যাম্পাসের এই অরাজকতা গত কয়েকদিন ধরে চলে আসছে। ছাত্রদল খুবই আক্রমনাত্মক আচরণ করেছে, যাকে পেয়েছে যাকে খুশি তাকে মেরেছে, রক্তাক্ত করেছে। তিনি আরো বলেন, মারামারির ঘটনায় ক্যাম্পাসের গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। আমরা সেটার প্রতিবাদ জানাতে গেলে আমাদের উপরও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হামলা করে।
জকসুর জিএস ও জবি ছাত্রশবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনী করলে ছাত্রদলের টেন্ডারবাজির রাজনীতি বিঘ্ন হবে তার জন্য এই হামলা করেছে তারা। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী, জকসু নেতা, শিবির, ছাত্রশক্তির নেতাদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে।
জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমাদের দাবি হলো দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ধাপের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে দেওয়া। যাতে করে আগেরমত লুটপাট না হয় কিন্তু তাদের দাবি এটা তারা ঠিকাদার দিয়ে করবে। সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার এই কাজের সুফল যদি শিক্ষার্থীরা না পায়। আর টাকা চলে যায় একটা গোষ্ঠীর পকেটে। তাহলে এই জুলাই বিপ্লব আর এত মানুষের জীবনের মূল্য কোথায়? ইতোমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আবাসন নির্মাণের কাজ পাচ্ছে ছাত্রদলের এক নেতা৷
অভিযোগ অস্বীকার করে এদিন বিকাল ৫ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনে সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনর জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ এসে ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে৷ প্রশাসন তাদের বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। আমরা তাদের সাথে কথা বলতে গেলে আমাদের দিকে তেঁড়ে আসে তারা৷ তাই ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মিলে শিবিরের সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছি।
বিকাল সাড়ে ৪ টায় উপাচার্যের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, আমি অনেক অনুরোধ করে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে আমাদের প্রোগ্রামে আসতে রাজি করিয়েছি। তার কাছে আমাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরার প্রত্যাশা রেখেছিলাম। কিন্তু এভাবে একজন সম্মানিত মেহমানকে অপমানিত করা কোনভাবে ঠিক হয়নি৷ যারা এসব কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে৷







