প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
বুধবার (৮ জুলাই) বিকালে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সিরাজগঞ্জ-১ আসনের তারকা চিহ্নিত সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
মো. সেলিম রেজার প্রশ্নটি ছিল, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা? থাকলে সেটা কী, এবং কবে নাগাদ এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে?
এমন প্রশ্নের জন্য মো. সেলিম রেজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে গঠিত আমাদের এই সরকার রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
বিগত দিনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার অবদান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতোপূর্বে ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯২ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সফল কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সেসময়ে উদ্ভূত রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করেছিলেন। তাঁদের সুযোগ্য দিকনির্দেশনায় সেই সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা দ্রুততম সময়ে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছিলো।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়েও পূর্বের সেই নীতির আলোকেই আমরা টেকসই, শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানের পথ অনুসন্ধান করছি। বিএনপি সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধানের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সকল ফ্রন্টেই অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’
রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করার লক্ষ্যে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইউএন এইচসিআর, ইউ এন ওমেন এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রগ্রামের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহ পরিদর্শন করেন এবং মানবিক সহায়তা আরও কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।’
তিনি বলেন, ‘চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এই সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তুরস্কের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশা করি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর পাশাপাশি, গত সেপ্টেম্বরে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ভবিষ্যতেও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বজনমতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণসমূহ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রতি বাংলাদেশ নৈতিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নিহিত। আর তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখার লক্ষে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে দ্বিপাক্ষিক ফ্রন্টে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি সকল পক্ষের সাথে সম্ভাব্য যোগাযোগ স্থাপন ও আলোচনার বিষয়টি আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তাছাড়া মূলধারার কূটনীতির পাশাপাশি confidence building-এর ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রক্রিয়া প্রয়োগের বিষয়টি আমাদের বিবেচনাধীন। একই সাথে প্রত্যাবাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইকরণ বা ভ্যারিফিকেশনের কাজ নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও চলমান আছে।’
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর সমাধানের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর।’
তিনি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হওয়া গুরত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সাথে সংলাপ জোরদার করেছি। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।’
বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে ও মানবিক সংকট মোকাবেলায় অত্যন্ত সুচিন্তিত, বাস্তবধর্মী ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ক্যাম্পসমূহের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাগতিক কমিউনিটির সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিকগণের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটি’ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।”
তিনি বলেন, “এর পাশাপাশি, ক্যাম্পসমূহে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদান ও তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় কৌশলগত নীতিনির্ধারণ ও অধিকতর সমন্বয়ের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স’ সার্বক্ষণিকভাবে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করছে।”
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে সসম্মানে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে বর্তমান সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।







