২০১৬ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনা দেশটির রাজনীতিতে অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক দশকেরও কম সময়ে সাতজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন, যা ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি দেশের সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তারা মূলত নিজ নিজ আসনের প্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’-এর সদস্য নির্বাচন করেন। নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হন।
এই ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো, ক্ষমতাসীন দল যেকোনো সময় অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের আস্থা হারান, তবে তাকে পদ ছাড়তে হয়। ফলে দেশে সাধারণ নির্বাচন না হয়েও শুধু দলীয় প্রধান পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। গত এক দশকে এই সুযোগের বারবার ব্যবহারই দেশটির রাজনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।
ব্রিটিশ রাজনীতির এই পটপরিবর্তনের আসল সূত্রপাত ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ) গণভোট থেকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার করলেও দেশের মানুষ বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন ক্যামেরন। ব্রেক্সিটের এই সিদ্ধান্ত দলগুলোর ভেতরের সমীকরণ ও ভোটারদের মনস্তত্ত্ব চিরতরে বদলে দেয়।
ক্যামেরনের পর ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ক্ষমতায় আসেন থেরেসা মে। কিন্তু দলীয় কোন্দলে চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নেন তিনি।
এরপর ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসেন বরিস জনসন। ব্রেক্সিট কার্যকর করলেও করোনা মহামারির সময়ে নিজের দেওয়া লকডাউনের নিয়ম ভেঙে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি করে বিতর্কে জড়ান তিনি। এই ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি ও এক সহকর্মীর যৌন নিপীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগে বাধ্য হন জনসন।
তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিজ ট্রাস ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী (মাত্র ৪৫ দিন) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন। কোনো তহবিলের উৎস ছাড়াই বড় অঙ্কের কর কমানোর ‘মিনি বাজেট’ ঘোষণা করলে ব্রিটিশ অর্থনীতি ও ঋণের বাজারে ধস নামে, যার জেরে বিদায় নেন তিনি।
এরপর দায়িত্ব নেওয়া ঋষি সুনাকও দুই বছরের বেশি টিকতে পারেননি। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট সামাল দিতে না পেরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। কিন্তু দুই বছর পার হওয়ার আগেই নানা অভ্যন্তরীণ বিতর্ক, নীতিগত অস্পষ্টতা ও সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের ভরাডুবির কারণে তাঁর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়।
অবশেষে সোমবার (২২ জুন) ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এক আবেগঘন বিবৃতিতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, “দলের আইনপ্রণেতারা প্রশ্ন তুলেছেন পরবর্তী নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমিই যোগ্য ব্যক্তি কি না। আমি সসম্মানে তাঁদের চাওয়া মেনে নিচ্ছি।” নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে লেবার পার্টি তাদের নতুন নেতা নির্বাচন করবে, যেখানে মেকারফিল্ডের উপনির্বাচনে জেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে অন্যতম প্রধান দাবিদার মনে করা হচ্ছে।







