পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার এক মহান বার্তা নিয়ে আসে। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকেই কোরবানি বলা হয়।
এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব বা পশু জবাইয়ের উৎসব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আল্লাহর প্রতি চরম আত্মনিবেদনের সুমহান ইতিহাস। তবে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত নির্দিষ্ট আর্থিক সামর্থ্য বা নেসাবের শর্তারোপ করেছে।
কোরবানির গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা কাউসারে নির্দেশ দিয়েছেন, অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, নামাজের মতোই কোরবানি একটি আবশ্যিক ইবাদত।
হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা ব্যক্তিকে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন, যা এর গুরুত্বকে আরও জোরালো করে।
মূলত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সেই অনুপম ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করতেই মুসলিমরা প্রতিবছর কোরবানি পালন করেন। ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো মুসলিমের কাছে যদি তার মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
নেসাবের পরিমাপ হলো- স্বর্ণের ক্ষেত্রে: সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি। রুপার ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি।
নগদ অর্থ বা অন্যান্য সম্পদ: যদি কারো কাছে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের নগদ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র থাকে, তবে তাকেও সামর্থ্যবান হিসেবে গণ্য করা হবে।
কোরবানির নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নগদ টাকা নয়, বরং ব্যবহারিক প্রয়োজনে লাগে না এমন সোনা-রুপার অলঙ্কার, অতিরিক্ত জমি, এবং বিলাসবহুল আসবাবপত্রও হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘আল মুহিতুল বুরহানি’ ও ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি’ অনুসারে, এই অতিরিক্ত সম্পদের মালিকের ওপর কোরবানি করা বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য যে, জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্ত থাকলেও কোরবানির ক্ষেত্রে কোরবানি চলাকালীন দিনগুলোতে নেসাবের মালিক হওয়াই যথেষ্ট।
কোরবানির মূল দর্শন কেবল রক্ত প্রবাহিত করা বা গোশত খাওয়া নয়। আল্লাহ তায়ালা সূরা হাজ্জে বলেছেন, আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।
অর্থাৎ, বান্দার অন্তরের ভক্তি এবং আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্যই এখানে আসল বিষয়। লোক দেখানোর মানসিকতা বাদ দিয়ে নিখাদ ইখলাসের সাথে কোরবানি করা প্রত্যেক মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।







