রমজানের শেষ প্রহর পেরিয়ে ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম জীবনে শুরু হয় এক অনন্য আনন্দের পাশাপাশি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কিছু আমলের সময়। এসব আমল আমাদের আল্লাহর আরো নৈকট্যশীল করবে, ঈমানি শক্তি বাড়াবে এবং আমলনামায় অধিক সওয়াব যোগ করবে।
রমজান শেষে প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কথা আসে, তা হলো সদকাতুল ফিতর। এটি ধনী-গরিব সবার মাঝে সহমর্মিতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ব্যবস্থা। রোজার ঘাটতি পূরণ ও দরিদ্রদের ঈদের আনন্দে শামিল করার উদ্দেশ্যে এই দান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা সুন্নত। আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহর মহত্ত্ব বর্ণনা করো (তাকবির বলো) আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। তাকবিরটি হলো- ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’ সুন্নত হলো, পুরুষরা মসজিদে, বাজারে ও ঘরে সব জায়গায় উচ্চৈঃস্বরে তাকবির দেবেন। নারীরা তাকবির দেবেন অনুচ্চস্বরে।
আল্লাহতায়ালা ঈদের দিন বান্দাদের জন্য ঈদের নামাজ প্রবর্তন করেছেন, যা তার জিকিরের পূর্ণতা দান করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার উম্মতের নারী-পুরুষ সবাইকে এ আদেশ দিয়েছেন।
ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে কিছু খেজুর খাওয়া বা মিষ্টিমুখ করা সুন্নত। বিশেষ করে বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রিয় নবীর অনুসরণ। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের সালাতে খেজুর না খেয়ে বের হতেন না এবং তিনি বেজোড় সংখ্যায় হিসাব করে খেতেন।’ (বুখারি : ৯৫৩)।
সম্ভব হলে রিকশা বা যানবাহন বাদ দিয়ে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া-আসা কাম্য। আলী (রা.) বলেন, ‘সুন্নাত হলো ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া।’ (তিরমিজি : ১২৯৬)।
ঈদের দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা ইসলামের সৌন্দর্যবোধেরই একটি অংশ। ওমর (রা.) একটি রেশমি পোশাক বাজার থেকে এনে রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এটা ক্রয় করে ঈদের দিন এবং মেহমানের উপস্থিতিতে ব্যবহার করুন।’ (বুখারি : ৯৪৮)।
জুমার খুতবা হয় নামাজের আগে। আর ঈদের খুতবা হয় নামাজের পর। নামাজের অপেক্ষায় জুমার খুতবা শুনলেও নামাজ শেষে ঈদের খুতবা শুনতে অনেকেই অমনোযোগী হন, এটা ঠিক নয়। কারণ এ খুতবা শোনা ওয়াজিব।
ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেয় পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়। তবে কোলাকুলিতে সীমিত না থেকে সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে অভিবাদন জানাতেন আমাদেরও তার প্রচলন ঘটানো উচিত। তারা পরস্পরকে বলতেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।’ (আল্লাহ আমার ও আপনার রমজানে করা সব ইবাদত কবুল করুন)।
সর্বোপরি ঈদগাহের সমাবেশ থেকে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর সামনে হাশরের মাঠে মহাজমায়েত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আখেরাতে মর্যাদার প্রকৃত পার্থক্য নির্ভর করবে আমল ও তাকওয়ার ওপর।
সব মিলিয়ে ঈদ শুধু আনন্দের উৎসব নয়; এটি এক আত্মজাগরণের সময়, যেখানে ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতার মাধ্যমে একজন মুমিন তার জীবনের নতুন দিকনির্দেশনা খুঁজে পেতে পারে।







