গত মাসে নিকাব পরিহিত এক নারী শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে ছয়জন ছাত্রকে এক বেঞ্চে বসতে দেখে তাদেরকে ‘গে’ ও ‘গরিব’ বলে মন্তব্য করার অভিযোগ উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। এরপর তাকে বিভাগের সব ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
সেসময় গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের গ্রীন বিজনেস স্কুলের প্রভাষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এএসএম কামরুল ইসলাম অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ফেসবুক পোস্টকারী এ শিক্ষক বামপন্থি শিক্ষকদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ শিক্ষক নেটওয়ার্কের (ইউটিএন) সদস্য হয়েও, আরেকজন সদস্যের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার কারণে তাকে শোকজ ও নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ থেকে বের করে দিয়েছে প্লাটফর্মটি।
গত ২২ অক্টোবর দেওয়া এ শোকজ লেটারের জবাব সাত দিনের মধ্যে দেওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ‘শোকজ’ ও সেটির ‘জবাব’ দুটোই সামনে এনে প্লাটফর্মটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন গ্রীন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এএসএম কামরুল ইসলাম।
আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার কারণ জানান। পোস্টটির কমেন্টে এ ব্যাপারে তিনি লেখেন, “আজকে নভেম্বরের ৮ তারিখ। দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করেও সংগঠনের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশের উত্তর প্রাপ্তির স্বীকারোক্তি বা কোনো ধরনের ফিরতি যোগাযোগ না করায় বিরক্ত হয়ে জিনিসটি জনসম্মুখে আনলাম। ইউটিএনের (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক) দিক থেকে ন্যূনতম সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ পেলে ফেসবুক অবধি এই আলাপ আনার কোনো ইচ্ছা ছিলো না।”
তিনি লেখেন, “চতুর্থ দফায় নিজ থেকে আবারও কাউকে মেসেজ করে জেনে নেবো আমার উত্তরটি পেয়েছে কিনা বা তাদের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কি (যেহেতু এটি তাদের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ছিলো এবং এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কোনো নোটিশ নয়, সুতরাং উক্ত সংগঠন আমার উত্তরটি ‘সন্তোষজনক/সন্তোষজনক নয়’ এই মর্মে তাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত জানানোর কথা), সে কাজ করার ধৈর্য আর নেই। আমার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত আছেন এমন কোন ইউটিএন সদস্য যদি কোনোক্রমে এই লেখাটি দেখে থাকেন, তবে অনুগ্রহ করে আপনাদের একদিনের মধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে বিবৃতি ড্রাফট করতে পারায় দক্ষ ও চৌকস রাইট আপ টিমকে জানাবেন আমাকে প্রত্যুত্তর করতে। কারণ, এটা আপনাদের সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা এবং ন্যূনতম ভদ্রতা।”
গ্রীন ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষক আরও লেখেন, “যেহেতু কারণ দর্শানোর নোটিশ বা তার প্রত্যুত্তর কোন গোপনীয় বা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা নয়, বরং একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বিষয়, তাই লেখাটি এখানে এভাবে দিলাম। আমার ঘটনার বিবরণীতে দুইজন সদস্যের সাথে (জনাব সামিনা লুৎফা ও জনাব অলিউল সান) আমার ঘটনাকেন্দ্রিক আলাপচারিতা যেহেতু ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়েছে (মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট) এবং মিটিং-এ আমার বিষয়ক আলাপের পূর্বে গ্রুপে আমাকে জানানো না হওয়ার বিষয়গুলিও ইউটিএনের প্রাইভেট গ্রুপ চ্যাটে হয়েছে, তাই আমি উক্ত সদস্যদ্বয় এবং সংগঠনের উক্ত গ্রুপচ্যাটের গোপনীয়তা বজায়ের স্বার্থে কোনরূপ তথ্যপ্রমাণ (স্ক্রিনশট ধরনের কিছু) প্রকাশ করলাম না। তবে উক্ত সংগঠনের কেউ যদি আমার বক্তব্য/অভিযোগকে অসত্য বলে দাবি করেন, তবে আত্মপক্ষ সমর্থনে আমাকে সেক্ষেত্রে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হতে পারে। অন্যথায়, করার ইচ্ছে নেই।”
২২ অক্টোবর দেওয়া শিক্ষক নেটওয়ার্কের দেওয়া শোকজে যা লেখা ছিল:
“গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত অনলাইন সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব প্রসঙ্গে আপনার ফেসবুক স্ট্যাটাস সম্পর্কে আলোচনা হয়। স্ট্যাটাসে বিধৃত আপনার মতামত নেটওয়ার্কের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় উপস্থিত ২০ জন সদস্যের মতানুসারে আপনার সদস্যপদ কেন স্থগিত করা হবে না তার কারণ দর্শানোর জন্য আপনাকে অবহিত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই ইমেইল প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে আপনার আত্মপক্ষ সমর্থনপূর্বক ফিরতি ইমেইল পাঠানোর অনুরোধ রইল।”
শোকজের জবাবে শিক্ষক এএসএম কামরুল ইসলাম যা লেখেন:
“কারণ দর্শানোর পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করে শুরু করছি। লেখার শেষ অংশে নোটিশের উত্তর প্রদান করবো। আমি বিগত ০৮/১০/২৬ আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে হিজাব নিয়ে কটাক্ষ করায় ক্লাস নেয়া থেকে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষক জনাব তাসনীম মাহবুবের বিষয়ে একটি পোস্ট দেই। উক্ত পোস্ট করার কিছু সময় পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আমার পোস্টটি শেয়ার করেন সংগঠনের অপর সদস্য জনাব সামিনা লুৎফা। কিন্তু সেখানে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য না করায় আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে লেখাটি গ্রুপে দেয়ার কারণ জানতে চাইলেও তিনি আমাকে কোনো প্রত্যুত্তর করেননি। তবে সে সময়ে গ্রুপে জনাব তাসনীম মাহবুবকে নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি সাপেক্ষে একটি সান্ধ্যকালীন অনলাইন সভার আলোচনা চলছিল এবং উল্লেখ্য, জনাব সামিনা লুৎফা আমার লেখাটি গ্রুপে দিলেও সেখানে এই বিষয়ে কেউ কোনো ধরনের মন্তব্যও করেনি।”
“রাত ১১টার দিকে নেটওয়ার্কের একজন সদস্য, জনাব অলিউর সান, কোনরূপ পূর্ব সংকেত ব্যতীরকে আমাকে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেন। এ ব্যাপারে আমি একই রাতে তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কারণ জিজ্ঞেস করি। তিনি আমাকে গ্রুপ থেকে সরানোর দুইটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেন। এক, আমার দীর্ঘদিন গ্রুপে অনিয়মিত থাকা, মিটিং বা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করা এবং দুই, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জনাব তাসনীম সিরাজকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে করা উপরোক্ত পোস্ট। তিনি আমাকে আরো জানান, একই রাতে একটি অনুষ্ঠিত অনলাইন সভায় উপস্থিত ২০ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক উক্ত দুই কারণে আমার সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।”
“তার প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে আমি তাকে জানাই, একই গ্রুপে আরো অসংখ্য সদস্য আছেন যারা একইভাবে অনিয়মিত, এবং আমি তাকে প্রশ্ন করি, কিসের ভিত্তিতে আমাকে অনিয়মিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, বা অনুপস্থিতি যাচাইয়ে ইউটিএন কোনরূপ রুব্রিক্স অনুসরণ করে কিনা, নাকি সভার সদস্যদের কাছে যদি 'মনে হয়' কেউ অনিয়মিত, তবে তাকে অনিয়মিত বলে বিবেচনা হয়? উনি আমাকে জানান, কোনো সদস্য অনিয়মিত কিনা তা যাচাইয়ে ইউটিএন কোনরূপ নির্ধারিত ম্যাট্রিক্স ব্যবহার করে না। সুতরাং, আমাকে কি কারণে সভায় বাকিদের অনিয়মিত বলে মনে হয়েছে সেটি সুস্পষ্ট নয়। আমি আশা করেছিলাম কারণ দর্শানোর নোটিশে এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটিও উল্লেখ করা হবে, অথচ আমাকে যে নোটিশটি প্রদান করা হলো এতে আমার অনিয়মিত থাকার ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রশ্নই করা হয়নি।”
“জনাব সান আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করলে আমি তাকে ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করার জন্যে জানাই। তার সাথে যোগাযোগের পর দুইদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে নোটিশ না পাওয়ার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি রাইটআপ টিমের সাথে এই ব্যাপারে দ্রুতই কথা বলবেন বলে আমাকে অবহিত করেন। কিন্তু পরবর্তী দুই সপ্তাহও কোনো ইমেইল না পাওয়ায় আমি তৃতীয়বারের মতো তাকে অবহিত করা সাপেক্ষে গত ২২ অক্টোবর, আমাকে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ১৫ দিন পর আমি কারণ দর্শানোর একটি নোটিশ ইমেইলের মাধ্যমে পাই।”
“তবে পরিতাপের বিষয় এই, আমাকে যে ভাষায় কারন দর্শানোর নোটিশটি দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত রকমের দায়িত্বহীন ও নিতান্ত হতাশাজনক। যেহেতু আমাকে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে আমাকে জানানো হয়েছে, আমার সদস্যপদ আপাতত স্থগিত, সুতরাং কারণ দর্শানোর নোটিশে অবধারিতভাবে আমার সদস্যপদের স্থগিতাদেশ কেন বলবৎ থাকবে না, অথবা কেন সদস্যপদ বাতিল হবে না; এই দুইটির যে কোনো একটি জানতে চাওয়ার কথা। কিন্তু আমাকে প্রদত্ত নোটিশে কেবল একটি কারণ দর্শিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন আমার সদস্যপদ স্থগিত করা হবে না, যেটি ইতোমধ্যেই আপনারা করেছেন। সুতরাং, কারণ দর্শানোর নোটিশের এ ধরনের হাস্যকর ভুলকে আমি চূড়ান্ত অপেশাদারিত্ব ও গুরুত্বহীনতা হিসেবে দেখছি। প্রায় দুই বছরের অধিক সময় ধরে নেটওয়ার্কের সদস্য থাকা একজন সদস্যের সদস্যপদ স্থগিতের মতো সিদ্ধান্তে এমন অবহেলা মূলত নেটওয়ার্কের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
“আসছি আপনাদের কারণ দর্শানোর প্রসঙ্গে। যেহেতু আমার অনিয়মিত থাকার বিষয়ের কোনো উল্লেখ নোটিশে নেই, তাই সে বিষয়ে আমি কোনরূপ ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়োজন বোধ করছি না। নোটিশে উল্লিখিত আমার ফেসবুক পোস্টের ব্যাপারে আমার বক্তব্য এই. আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মতামত ও বিচারবোধ থাকে, এবং যে যার মতামত কীভাবে প্রয়োগ করবে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমি ইউটিএন এর একজন সদস্য হিসেবে সংগঠন সংশ্লিষ্ট কোনরূপ বিষয়ে ভিন্ন কোনো ফোরামে মন্তব্য করা সাপেক্ষে সংগঠন আমার কাছে জবাবদিহিতা চাইতে পারে, তবে যদি আমি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করি তবে তা কোনোভাবেই আমাকে সাংগঠনিকভাবে দায়বদ্ধ করে না। যেহেতু অভিযুক্ত ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, সুতরাং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার সমালোচনা করার শতভাগ অধিকার আমার আছে। যতক্ষণ না আমি সংগঠনকে জড়িয়ে কোনো মন্তব্য করছি, ততক্ষণ অবধি আমার ব্যক্তিগত মতামতকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো এখতিয়ার ইউটিএন এর নেই। তবে ইউটিএন যদি মনে করে তাদের দুইশো সদস্যের কেউ কারোর ব্যাপারে কোন ধরনের প্ল্যাটফর্মেই কেউ কোন সমালোচনা করতে পারবে না, তবে এটিকে একটি নীতি বিবর্জিত রাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠন ব্যতীরকে আর ভিন্ন কিছু বলার কোন অবকাশ থাকবে না।”
“যেহেতু অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বক্তব্য সাংঘর্ষিক এবং ইউটিএন এর অধিকাংশ সদস্য কোনরূপ তদন্তের পূর্বেই সরাসরিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সুতরাং, কোনরূপ তদন্তের পূর্বে আমিও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয়ার শতভাগ অধিকার রাখি। উল্লেখ্য, উক্ত ক্লাসের অডিও রেকর্ডে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য ও তার ফেসবুক লাইভে এসে দেয়া আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য সরাসরিভাবে সাংঘর্ষিক। এহেন পরিস্থিতিতে, প্রমাণ থাকার পরেও কেবলমাত্র একই প্ল্যাটফর্মের সদস্য হওয়ায় একজন অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়ানোটা আমার নীতিগত অবস্থানের পরিপন্থি। যে কারণে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে, এবং উক্ত মন্তব্যে যেহেতু সংগঠনের কোন উল্লেখ নেই, সুতরাং আমার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহনেরও কোনরূপ এখতিয়ার ইউটিএন রাখে না।”
আরো উল্লেখ্য, উক্ত অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন সাপেক্ষে তাকে কোনরূপ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া ব্যতিরেকেই তাকে শ্রেণি কার্যক্রম হতে অব্যাহতি দেওয়ায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। অথচ, ঠিক একই দিনে, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বেলায় আমাকে কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই আমার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে, এবং আমাকে তার পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করে সদস্যপদ স্থগিতের কারণ জানতে হয়েছে। একই দিনে একই সংগঠনের এক সদস্যের বেলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার দাবি তুলে, অপরদিকে অন্য এক সদস্যকে একই কায়দায় গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া সংগঠনের সিদ্ধান্ত প্রণেতা ব্যক্তিদের দ্বিচারিতা ও আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ব্যতিরেকেই অন্য কিছু নয়। এ ধরনের নগ্ন পক্ষপাত অননুমিত না হলেও হতাশাজনক।
“যেহেতু, এই সংগঠন মনে করে যে, সংগঠনের প্রভাবশালী সদস্যরা অভিযুক্ত/অপরাধী হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা করা যাবে না; এবং, এই সংগঠন মনে করে যে, সংগঠনের কোনো প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সাপেক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পূর্বে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অনুচিত, তবে একই দিনে সংগঠনের অন্য অগুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে; এবং, আমি উক্ত গ্রুপে যুক্ত থাকার পরেও আমার সদস্যপদ রহিতকরণ বিষয়ক কোনো এজেন্ডা উক্ত অনলাইন সভার পূর্বে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে উল্লেখ করা হয়নি, বা সভা চলাকালীন সময়ে বিষয়টি উত্থাপিত হলেও কেউ আমাকে গ্রুপে সভায় যুক্ত হতে বলেননি।”
“আমার অনুপস্থিতিতে যেহেতু মনগড়া মেট্রিকে আমাকে অনিয়মিত বিবেচনা করে আমাকে সদস্যপদ থেকে সরানো হয়েছে, এবং চূড়ান্ত হাস্যকর বিষয় হচ্ছে আমি দুই বছর ধরে সদস্য থাকার পরেও, ঠিক যেদিন আমি একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের ব্যাপারে সমালোচনা করলাম, ঠিক ঠিক সেদিন সন্ধ্যাতেই সভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে হয়েছে আমি একজন অনিয়মিত সদস্য (ঠিক যেভাবে সালমান মুক্তাদির কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় হঠাৎ করে তার ব্যাংক হিসাব নিয়ে রাষ্ট্র চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো, অনেকটা সেরকমভাবেই।); এবং, কারণ দর্শানোর নোটিশে আমার অনিয়মিত থাকার 'অভিযোগটি' সরাসরি অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র আমার ফেসবুক পোস্টটি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। (কারণ জনাব অলিউল সান স্বীকার করেছেন, কে নিয়মিত কে অনিয়মিত তা যাচাইয়ে এই সংগঠনের কোন নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই)”
“একজন প্রভাবশালী সদস্যকে কেন্দ্র করে একদিনের মধ্যে বিবৃতি দিতে পারা সংগঠন অপর এক সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদানে দুই সপ্তাহ সময় নেয় (সেটিও আমার পক্ষ থেকে তিনবার যোগাযোগ করার পর), আমার সদস্যপদ স্থগিত করার পরেও নোটিশে আমাকে পুনরায় জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন আমার সদস্যপদ স্থগিত হবে না (যা ইতোমধ্যে করা হয়েছে), যার ফলে একজন সদস্য হিসেবে আমাকে নিতান্ত অগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতীয়মান করা হয়েছে; সুতরাং, সব তথ্য-প্রমাণ ও আলোচনা সাপেক্ষে, আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ও সংগঠনের অবস্থান বিবেচনায় এটি প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তার সব সদস্যকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ ও অনাগ্রহী, এবং এই সংগঠন তার প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধে যে কোন প্ল্যাটফর্মে কোন প্রকারের সমালোচনা গ্রহণ করতে রাজি নয়। সার্বিক পর্যালোচনার নিরিখে, আমার সদস্যপদ স্থগিতাদেশের এই পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তকে আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমি নিজ সিদ্ধান্তে, এই সংগঠনের সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ালাম।”
গত ৮ অক্টোবর দেওয়া যে ফেসবুক পোস্টের কারণে শোকজ:
“নারী শিক্ষার্থীকে হিজাব পরে ক্লাসে আসার 'অপরাধে' উগ্রবাদী আখ্যা দেয়া ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপিকাকে সংশ্লিষ্ট বিভাগে ক্লাস নেয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের বর্ণনা যদি সত্য হয়, কিংবা অর্ধেকও সত্য হয়, তবে এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্তসাপেক্ষে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তবে এটি অবশ্য ঔচিত্যের জায়গা থেকে আমার চাওয়া। বাস্তবে উনার মতো প্রথিতযশা ও শক্ত খুঁটির প্রফেসরের একটি চুলও যে কেউ ছিড়ঁতে পারবে না তা আসলে বলা বাহুল্য। নিউজ বরাতে দেখলাম, উনার ব্যাপারে এই অভিযোগ নতুন কিছু না। অতীতেও তিনি একই ঘরানার কর্মকাণ্ড করে এসেছেন, সমালোচনা হয়েছে, তবে একাডে্মিক্যালি কোন ব্যবস্থাই তার বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি। এবারেও হবে বলে মনে হচ্ছে না, তবে ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেয়াটা অন্তত মন্দের ভালো, এই আরকি।”
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের হিজাব বিদ্বেষ নতুন কিছু না। এই চর্চাটি কালেক্টিভ ও ঘুরেফিরে একই ঘরানার লোকেরা করে থাকেন। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে কেউ হিজাব করামাত্রই সে গোপনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করে কিংবা সে জঙ্গী, এই ধরনের এবসার্ড চিন্তাধারা ও মানসিকতার শিক্ষকেরা দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন, এই চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। যেহেতু শিক্ষার্থীদের পোশাকের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত কোন বাধ্যবাধকতা নেই, সুতরাং, কে কি পরে আসবে না আসবে সে বিষয়ে কাউকে জনসমক্ষে হেয় করার অধিকারও উক্ত ভদ্রমহিলার নেই।”
“কোনো মেয়ে কি কোনোদিন তাকে বলেছে যে ম্যাডাম আপনি নারী হয়েও চুল ছোট কেন রাখেন, আপনাকে দেখতে ছেলেদের মতো লাগে? বলেনি। কেউ কি বলেছে ম্যাডাম আপনি শাড়ি পরে কেন আসেন, কেন সালোয়ার কামিজ পরে আসেন না? বলেনি। তাহলে কোনো শিক্ষার্থী কেন হিজাব পরলো এই নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও তাকে উগ্রবাদী বলার স্পর্ধা উনি পায় কোথা থেকে? কারণ তিনি জানেন, এই কাজ করার পর সমালোচনা হলে তিনি ভিক্টিমকে কোন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সহযোগী হিসেবে দায় দিয়ে পার পেয়ে যাবেন। অথচ তিনি জানেনই না যে বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের মেয়ে ঘরের বাইরে গেলে হিজাব করে বা বোরকা পরে!”
“উনার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আমি তেমন জানি না, তাই প্রশ্ন তুলবো না। তবে উনার মন-মানসিকতা যে অত্যন্ত নিম্ন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ আসলে নাই। উনার আসলে হওয়া উচিত ছিলো ব্র্যাক বা নর্থ সাউথের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গরিবি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে গ্রাম থেকে নিজ যোগ্যতায় পড়াশুনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া গেরাইম্মা অশিক্ষিত ও বোরকা পরা মেয়েদের পড়াশুনা করতে আসে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় উনার জন্যে না।”
“এনিওয়ে, উইথ নো ডাউট অর সারপ্রাইজ, উনি একজন বেশ পরিচিত নারীবাদী। শি ইজ জাস্ট অ্যানাদার টেস্ট কেইস অফ হাউ বাঙ্গাল নারীবাদ ওয়ার্কস। আমি সবসময়ই বলি, বাঙ্গু নারীবাদীদের আমি মনেপ্রাণে অপছন্দ করি, কারণ আমি জানি, এরা প্রত্যেকে নিজেদের রেডিয়াসের বাইরের অপরাপর নারীদের নিয়ে মনে তীব্র ঘৃণা পুষে রাখে।”
এর আগে, গত ৭ অক্টোবর ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ) একটি ক্লাসে নেকাব পরা এক ছাত্রীকে নিয়ে ওই শিক্ষক আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নেকাব ও পর্দা নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে ওই ছাত্রীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (মৌলবাদী) ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এমনকি ওই ছাত্রী বোমা হামলা করতে পারেন— এমন মন্তব্যও করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাস বর্জন করেন এবং পরে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে ৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে সাময়িকভাবে সব ধরনের ক্লাস কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়।
এদিকে, তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে ক্লাস কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিবাদে গত রবিবার (১১ অক্টোবর) শ্রেণিকক্ষে মুখে কালো কাপড় বেঁধে অভিনব প্রতিবাদ জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষক নেটওয়ার্কের নেত্রী সামিনা লুৎফাসহ প্লাটফর্মটির অনেকে। একই সঙ্গে অন্য শিক্ষকদেরও এ ধরনের প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তারা।







