ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিচার্জ করে। এসব ঘটনায় শিল্প পুলিশ, মহানগর ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সোমবারের ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন তথ্যকে গুজব উল্লেখ করে তিনি শ্রমিক ও নগরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। একই সময়ে শফিপুর, চন্দ্রা, গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, মালেকের বাড়ি, কোনাবাড়ী ও সালনাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামেন।
একপর্যায়ে কয়েকটি স্থানে সড়কে ঝুট কাপড়, বাঁশ ও কাঠ জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে মহানগরের নাওজোর এলাকায় পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের দুটি গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কালিয়াকৈর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানেও আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, শিল্প পুলিশ, জেলা পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। পরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে বেলা ১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
শিল্পাঞ্চল-২ (গাজীপুর) পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সোমবার সকালেও কালিয়াকৈর উপজেলার শফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎসহ গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। তারা বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটান। পরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেন। কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে যান চলাচল শুরু করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্প পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা রয়েছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন সহিংস ঘটনার বিষয়ে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। সোমবারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অথচ একটি কুচক্রী মহল সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়াচ্ছে। এসব অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত তথ্যের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে শ্রমিক ও নগরবাসীকে কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে শান্ত থাকার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান পুলিশ কমিশনার।
এর আগে রোববারও গাজীপুরের মৌচাক, শফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই দিন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। কয়েকটি কারখানার সামনে ভাঙচুর, ট্রাফিক পুলিশ বক্সে হামলা ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। দুই দিনের এসব ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, জানমাল ও সরকারি-বেসরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। সরকার এ বিষয়ে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে শ্রমিক, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগামী জানুয়ারি থেকে বেতন বাড়তে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ অবস্থায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পকারখানা সচল থাকলে শ্রমিক, গাজীপুর ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু দুষ্কৃতকারী উসকানিমূলক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে শ্রমিকদের সতর্ক থেকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মজুরি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম সচল রাখতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।







