ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানের বড় পরাজয় বরণ করেছে বাংলাদেশ। ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শুরুতে আশার আলো দেখালেও পরে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। তানজিদ হাসান তামিমের ৪৬ ও সাইফ হাসানের ২৬ রানের ইনিংস ছাড়া উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি আর কেউ। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানে অলআউট হয়ে ব্যাটিং ব্যর্থতার এক বিব্রতকর অধ্যায় দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু করেছে বাংলাদেশ।
৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শনিবার (১৭ অক্টোবর) আবুধাবিতে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৭১ রান সংগ্রহ করে জিম্বাবুয়ে। শুরুতে তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ২৪ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়েছিল দলটি। তবে ক্রেইগ আরভিন ও ব্রেন্ডন টেলরের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই করার মতো সংগ্রহ গড়ে জিম্বাবুয়ে। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে ভালো করলেও সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। একের পর এক উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে হার মেনেছে তাওহীদ হৃদয়ের দল।
এদিন চোটের কারণে বাংলাদেশের নিয়মিত অধিনায়ক লিটন দাস খেলতে পারেননি। তার অনুপস্থিতিতে দলকে নেতৃত্ব দেন সহ-অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই তাসকিনের গতির মুখে পড়ে জিম্বাবুয়ে। ইনিংসের প্রথম ওভারেই ব্রায়ান বেনেটকে ফিরিয়ে দেন বাংলাদেশের এই পেসার। পঞ্চম ওভারে বেন কারানকেও সাজঘরে পাঠান তিনি। ৬ বলে কোনো রান না করা বেনেটের পর ১১ বলে ৬ রান করে ফেরেন কারান। ১৭ রানেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে।
এরপর ওয়ানডেতে অভিষিক্ত তাফাদজওয়া টিসিগাকেও ফিরিয়ে দেন তাসকিন। তার বলে পুল করতে গিয়ে আকাশে বল তুলে দেন টিসিগা। উইকেটের পেছনে ক্যাচটি তালুবন্দী করেন নুরুল হাসান সোহান। তাসকিনের তৃতীয় শিকারে পরিণত হন এই ব্যাটসম্যান। ২৪ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে জিম্বাবুয়ে।
তবে শুরুর সেই ধাক্কা সামলে দলকে লড়াইয়ে ফেরান ক্রেইগ আরভিন ও ব্রেন্ডন টেলর। চতুর্থ উইকেটে দুজনের দৃঢ়তায় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ে। উইকেটের চারপাশে দারুণ সব শটে রান তুলে দুজনই ফিফটি করেন। তাঁদের ব্যাটে ভর করে বড় সংগ্রহের পথে এগোতে থাকে দলটি।
ফিফটির পরও থামেননি আরভিন-টেলর। দুজনই এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। তবে শতকের মাইলফলক ছোঁয়ার আগেই থামতে হয় তাদের। ১০১ বলে ৮১ রান করা টেলরকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন সাইফ হাসান।
এদিন ক্যারিয়ারের ৪০তম ফিফটি করেন জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ব্রেন্ডন টেলর। বাংলাদেশের বিপক্ষে এটি ছিল তার দশম ফিফটি। এই ইনিংস খেলার পথে ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও নিজের করে নেন ডানহাতি এই ব্যাটার। পেছনে ফেলেন আরেক কিংবদন্তি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকে। টেলরের বিদায়ের পর অধিনায়ক সিকান্দার রাজাকেও ফিরিয়ে দেন সাইফ। ৫ বলে ৪ রান করে সাজঘরে ফেরেন রাজা। টানা দুই ওভারে দুই উইকেট তুলে নিয়ে জিম্বাবুয়েকে আবারও চাপে ফেলে বাংলাদেশ।
এর আগে ওয়েসলি মাধেভেরেকে ফিরিয়ে নিজের প্রথম উইকেটের দেখা পান রিশাদ হোসেন। ১৫ বলে ১৭ রান করে ফেরেন মাধেভেরে। এরপর আরভিনের উইকেট নিয়ে জিম্বাবুয়ের বড় জুটি ভাঙেন শরিফুল ইসলাম। নুরুল হাসান সোহানের দুর্দান্ত ক্যাচে থামে আরভিনের ইনিংস। ১০৬ বলে ৯৩ রান করেন এই ব্যাটসম্যান। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৭ রান দূরে থাকতে ফিরতে হয় তাকে।
শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের রান তোলার গতি কমিয়ে দেন বাংলাদেশের বোলাররা। ব্র্যাড ইভান্সকেও ফিরিয়ে দেন শরিফুল। আবারও উইকেটের পেছনে ক্যাচ নেন সোহান। ৯ বলে ৫ রান করে ফেরেন ইভান্স। তবে শেষ দিকে নিউম্যান নিয়ামহুরি ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। সুযোগ বুঝে বাউন্ডারি মেরে স্কোরবোর্ড সচল রাখেন দুজন। এ সময় কয়েকটি ক্যাচও ফেলেছিল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৭১ রান সংগ্রহ করে জিম্বাবুয়ে। নিয়ামহুরি ১৭ বলে ২১ এবং মাসাকাদজা ১৫ বলে ২১ রানে অপরাজিত থাকেন।
বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৩ উইকেট নেন তিনি। শরিফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান পান ২টি করে উইকেট। রিশাদ হোসেন নেন ১ উইকেট।
২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়ায় চার মেরে রানের খাতা খোলেন তানজিদ হাসান তামিম। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন বাঁহাতি এই ওপেনার। পুল, ডাউন দ্য উইকেটে এসে খেলা শট এবং পয়েন্ট ও কাভারের মাঝ দিয়ে বাউন্ডারি মেরে রান তুলতে থাকেন তিনি। অন্যদিকে সৌম্য সরকারও শুরুতে কয়েকটি বাউন্ডারি আদায় করে নেন। দুই বাঁহাতি ব্যাটারের ব্যাটে ভালো শুরু পায় বাংলাদেশ।
তবে তানজিদ যখন সাবলীলভাবে রান তুলছিলেন, তখন বাউন্স সামলাতে সমস্যায় পড়েন সৌম্য। জিম্বাবুয়ের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানির বাউন্সারে পরাস্ত হয়ে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দেন তিনি। বেনেটের হাতে ধরা পড়ার আগে ১৭ বলে ৯ রান করেন সৌম্য। সপ্তম ওভারে ৪৭ রানে ভাঙে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি।
এরপর মাত্র তিন বলের ব্যবধানে দুই উইকেট হারিয়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। পেসার নিউম্যান নিয়ামহুরির বলে পয়েন্টে ক্যাচ দেন তানজিদ। নিচু হয়ে আসা বলটি দারুণ দক্ষতায় তালুবন্দী করেন বদলি ফিল্ডার রায়ান বার্ল। ৩৮ বলে ৯টি চার ও ১ ছক্কায় ৪৬ রান করে ফেরেন তানজিদ। পরের ওভারে ব্র্যাড ইভান্সের ফুলার লেন্থের বলে এলবিডব্লিউ হন নাজমুল হোসেন শান্ত। ৮ বলে ৪ রান করে সাজঘরে ফেরেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর দলকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তাওহীদ হৃদয় ও সাইফ হাসান। দুজনই উইকেটে থিতু হয়ে রান তোলার দিকে মনোযোগ দেন। কিন্তু তাঁদের সেই চেষ্টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সিকান্দার রাজার ঘূর্ণিতে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তাওহীদ। প্রথমে আম্পায়ার আউট না দিলেও রিভিউ নিয়ে সফল হয় জিম্বাবুয়ে। ২১ বলে ১৩ রান করে বিদায় নেন বাংলাদেশের অধিনায়ক।
এরপর মোসাদ্দেক হোসেনও ইনিংস বড় করতে পারেননি। চার মেরে রানের খাতা খুললেও হ্যামিলটন মাসাকাদজার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। ১৮ বলে ১১ রান করেন মোসাদ্দেক। একের পর এক উইকেট হারিয়ে তখন চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
সাইফ হাসান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে হ্যামিলটন মাসাকাদজার বলে কট বিহাইন্ড হয়ে ফেরেন তিনিও। বাড়তি টার্ন পাওয়া বলে ব্যাটে ঠিকমতো সংযোগ ঘটাতে পারেননি সাইফ। ৩৭ বলে ২৬ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। এরপর ব্র্যাড ইভান্সের শর্ট বলের ফাঁদে পড়েন নুরুল হাসান সোহান। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। বদলি ফিল্ডার মারুমানির হাতে ধরা পড়ার আগে ৮ বলে ৫ রান করেন সোহান।
একই ওভারে আরেকটি উইকেট তুলে নেন ইভান্স। শর্ট বলের সামনে টিকতে পারেননি শরিফুল ইসলামও। চার বল ক্রিজে কাটিয়ে মিডউইকেটে ক্যাচ দেন তিনি। কোনো রান না করেই ফেরেন শরিফুল। ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি ছিল তার তৃতীয় ডাক। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে শেষ দিকে কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেন রিশাদ হোসেন। নিয়ামহুরির এক ওভারে চারটি বাউন্ডারি মেরে আশার আলো দেখিয়েছিলেন তিনি। তবে সিকান্দার রাজা বোলিংয়ে ফিরেই প্রথম বলে রিশাদকে ফিরিয়ে দেন। অফস্পিনারের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অনে ক্যাচ দেন রিশাদ। ৩৩ বলে ২৩ রান করেন তিনি।
শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরেন মোস্তাফিজুর রহমান। ইভান্সের স্লোয়ার বুঝতে না পেরে ব্যাট চালালে ফিরতি ক্যাচ দেন তিনি। মোস্তাফিজের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ৩৩.৪ ওভারে ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। তাতে ৯৯ রানের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জিম্বাবুয়ে।







