মাহমুদুর রহমান

ডিবির সেকাল ও একাল

Post Image

সপ্তাহ দুয়েক আগে ডিবির প্রধান কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। পাঠক আবার ঘাবড়ে যাবেন না। বিএনপি সরকার এখনো আমার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো মামলা দেয়নি। অথবা পুলিশের কোনো উপর মহল থেকেও ওখানে যাওয়ার নির্দেশ আসেনি। কারো ডাকে নয়, আমি নিজ থেকেই সেখানে গিয়েছিলাম পুরোনো স্মৃতির খোঁজে। ডিবির বর্তমান প্রধান শফিকুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানাই যে তিনি আমাকে তার রাজত্ব ঘুরে দেখতে সহযোগিতা করেছেন। আসলে বয়স তো অনেক হয়ে গেল। তাই পৃথিবী ছেড়ে একেবারে চলে যাওয়ার আগে সব পুরোনো জায়গায় গিয়ে সুখ ও দুঃখ, উভয় স্মৃতি রোমন্থন করতে ভালো লাগে।

২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে নির্বাসন থেকে ফিরে স্বদেশে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার আগেই দেশের এক অন্যতম রাজ দৌহিত্রকে আমেরিকায় কথিত অপহরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগের মামলায়, পাঁচ দিনের জন্য কাশিমপুর জেলে গিয়ে পাঁচ বছর কারাবাসের স্মৃতি ঝালাই করে এসেছিলাম। তখনই ভেবেছিলাম সুযোগ পেলে একবার ডিবিতে যাব। ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত কয়েক দফা রিমান্ডে প্রায় তিন সপ্তাহ যেখানে ছিলাম, সেখানকার বর্তমান অবস্থা দেখার বেশ ইচ্ছা হচ্ছিল। জনাব শফিককে ফোন করে আমার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা মাত্র তিনি সাদরে সম্মতি দিয়েছিলেন। বিমানবন্দরের উল্টোদিকের র‍্যাবের টিএফআই সেলও দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী জমানায় প্রফেসর ইউনূস তার লোকজন নিয়ে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের সময় আমাদের মতো নমঃশূদ্র ভিকটিমদের না ডাকায় সেখানে যাওয়ার আর সুযোগ হয়নি। আর এখন তো বোধহয় সেই আয়নাঘরের অনেক কিছুই ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে শুনেছি আমার ‘জেল থেকে জেলে’ বইতে লেখা আয়নাঘরের গল্প নাকি আইসিটি মামলায় ‘এভিডেন্স’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কারাগারে বসে লেখালেখির পরিশ্রম সার্থক হয়েছে জেনে ভালো লেগেছে। ডিবি সফরের গল্পে ফিরি।

মিন্টো রোডে ডিবির প্রধান ফটকে ঢুকতে গিয়ে রাস্তার উল্টো দিকের ফুটপাতের দিকে চোখ পড়তেই আমাকে ২০১০ সালের এক সকালে পুলিশ প্রহরায় ডিবি থেকে র‍্যাবে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল। আমার বৃদ্ধ মা সেই কাকডাকা ভোরে ফুটপাতে তার এক দীর্ঘদিনের শিক্ষয়িত্রী বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ডিবির গেটের দিকে তাকিয়ে ধুলোর মধ্যে বসে ছিলেন। পুলিশের পিকআপের ভেতর থেকেই হাত নেড়ে জানাতে চেয়েছিলাম, আমি তাদের দেখতে পেয়েছি। রিমান্ড শেষে জেলে ফিরে যাওয়ার পর সেখানে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেনেছিলাম, আমার মাও সেদিন আমার হাত নাড়া দেখতে পেয়েছিলেন। আমার মা এবং স্ত্রী পুলিশের গাড়ি অনুসরণ করে উত্তরায় র‍্যাব-১-এর মূল দরজা পর্যন্ত পৌঁছেও গিয়েছিলেন। সেখানে দুজনের সঙ্গে খুবই উদ্ধত আচরণ করা হয়েছিল। তারা আমাকে আয়নাঘরে আনার কথা বেমালুম অস্বীকার করে দুই নারীকে সেদিন গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছিল। ডিবির সামনের ফুটপাতে আমার মা এবং স্ত্রী রাতের পর রাত বসে থেকেছেন।

সেই মা এখন পুরান ঢাকার জুরাইনের কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছেন। মায়ের সেই শিক্ষয়িত্রী বান্ধবীও বিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইন্তেকাল করেছেন। মহান আল্লাহতায়ালা যেন তাদের উভয়কে পরম করুণায় অনন্ত জীবনে আশ্রয় দেন। আমার মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি আর তার ক্ষুদ্র পরিবারের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ের কাহিনি আজকের ভাগ্যবান ক্ষমতাসীনদের কখনো জানার উৎসাহ হয়নি। বন্দিত্বের পাঁচ বছরে কয়েক দফায় ডিবিতে আমাকে একাধিক হাজত এবং একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারের অফিস ঘরে রাখা হয়েছিল। এসির সেই টিনের ছাদের অফিসঘর ভেঙে ফেলাতে সেখানে আর যাওয়া হয়নি। তবে বেশ কিছুক্ষণ হাজত এলাকা পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছি।

২০১০ সালে আমার দেখা হাজতের সঙ্গে আজকের হাজতের অবশ্য অনেকটাই অমিল। সেখানকার সার্বিক অবস্থার বিস্ময়কর উন্নতি ঘটেছে। আমার আটকের সময় ছোট এবং বড়, দুটো হাজত ছিল। এখন সচিব এবং তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার অভিযুক্তদের ডিবিতে রাখা ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন নম্বর পৃথক হাজত তৈরি করা হয়েছে। কথিত ভিআইপিদের হাজতের শৌচাগারে কমোডেরও নাকি ব্যবস্থা আছে। তখনকার অসমান সিমেন্টের মেঝে এখন টাইলস দ্বারা আবৃত। নোংরা টয়লেট বেয়ে তেলাপোকা, তেঁতুলে বিছা উঠে এসে তখনকার সিমেন্টের মেঝের কোণে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। তেলাপোকায় আমার কোনো ফোবিয়া নেই, তবে তেঁতুলে বিছা দেখলে বেশ গা শিরশির করত।

সবচেয়ে বড় কথা, পুরো হাজত এলাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে। আমাদের সময় হাজতের লোহার শিকের বাইরে একটা ব্রিটিশ আমলের বিশাল ফ্যান ঘুরত, যার বাতাসের চেয়ে আওয়াজ অনেক বেশি ছিল। ডিবিতে একবারের অভিজ্ঞতার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। সেবার পুরো গ্রীষ্মকালে রমজান মাস পড়েছিল। ভয়াবহ গরমের মধ্যে এক হাজতে আমরা এক রাতে তিরিশের ওপর বাসিন্দা ছিলাম, যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় সর্বোচ্চ জনা-বিশেক লোকের জায়গা হতে পারে। সে রাতে বাধ্য হয়ে কয়েকজনকে পূতিগন্ধময় বাথরুমে গিয়ে পর্যন্ত শুতে হয়েছিল।

তীব্র গরম এবং এত মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে মাঝরাতের দিকে আমার খানিকটা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কোনোমতে গরাদের কাছে এসে নাক বাইরে দিয়ে সাহরি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম। নোংরা টয়লেটে প্যান ব্যবহারে সমস্যা হলে অনেক বলে কয়ে দিনের বেলা কোনো একজন ডিবি কর্মকর্তার অফিসকক্ষে গিয়ে বাথরুমের কাজ ও গোসল সারতে হতো। রিমান্ডের সময় প্রায় অনাহারেই থাকতাম, যাতে রাতে কিছুতেই টয়লেটে যেতে না হয়। কেমন করে সুস্থ ছিলাম ভাবলে অবাক লাগে।

সবটাই মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। এখন যে সুশীলরা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অপরাধে বন্দি মন্ত্রীদের অবস্থা নিয়ে চোখের পানি ফেলেন, তাদের কাউকে ফ্যাসিবাদের পনেরো বছর প্রতিবাদ করতে শুনিনি। ‘অধিকার’ ছাড়া আর কোনো নারীবাদী কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরা কোনো দিন আমার মা কিংবা স্ত্রীকে কোনো সান্ত্বনাবাক্য বলতে আসেননি। আমার দেশের সাংবাদিকদের বাইরে বিএনপির বেশ কয়েকজন নারী এমপি এবং নেত্রী মিন্টো রোডে গিয়ে সে সময় তাদের সমবেদনা জানিয়ে এসেছেন। আমার ওপর জুলুম ফ্যাসিবাদী শাসনের কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না। সব বিরোধী দল এবং ভিন্ন মতের মানুষদের রাষ্ট্রীয় জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। হয়তো জুলুমের মাত্রার প্রকারভেদ ছিল। দীর্ঘ জেলজীবনে অত্যাচারিতদের ভয়াবহ সব কাহিনি শুনতাম আর ভাবতাম বাংলাদেশের এই অমানিশা কি আদৌ কাটবে। মহান জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের সেই অমানিশা কাটাতে পেরেছে।

আমাদের নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমান সরকারি দলের বেশ কিছু রাতারাতি ভাগ্যবানদের ৩৬ জুলাইকে তুচ্ছ করে কথা বলতে দেখে তাদের অকৃতজ্ঞতার মাত্রায় বিস্মিত হই। তারা সব টকশোতে এমনভাবে কথা বলেন, যেন আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, আনাসদের আত্মত্যাগ খুব সাধারণ ঘটনা ছিল! পবিত্র কোরআন শরিফে আল্লাহতায়ালা মানুষ জাতটাকেই অকৃতজ্ঞ এবং স্বার্থপর বলেছেন। কী জানি, রাজনীতিবিদদের মধ্যে হয়তো এই অকৃতজ্ঞতার মাত্রা অন্যদের চেয়ে চরিত্রগতভাবেই বেশি হয়ে থাকে। যাই হোক, এবার ডিবিতে গিয়ে পুলিশের সব তরুণ অফিসারের সঙ্গে কথা বলে আশাবাদী হয়েছি।

ডিবির বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হলো বন্দিদের সঙ্গে অন্তত মানুষের মতো আচরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রচুর লেখালিখি করেছি, বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছি। কাজেই আজকের ডিবির এই উন্নতি দেখে প্রকৃতই আনন্দ অনুভব করেছি। আমাদের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট শাসক গোষ্ঠী যে অমানবিক আচরণ করেছিল, আমি একেবারেই চাইব না যে, আজ তাদের সহযোগীদের সঙ্গে একই আচরণ করা হোক। আওয়ামী আমলের মতো বর্বরতা নয়, রাষ্ট্র যেন আইন দ্বারা পরিচালিত হয়, সেটাই সব সুনাগরিকের কাম্য।

তাই ডিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেন ভিন্ন মতকে দমনের জন্য নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহৃত কিংবা দানব ‘হারুনের ভাতের হোটেলে’ পরিণত না হয়, বর্তমান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে সেটাই প্রত্যাশা। জাতির জন্য দুর্ভাগ্য যে, পনেরো বছর যাবতীয় অন্যায় করেও শেখ হাসিনা বিভিন্ন কারণে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছিলেন। এই দেড় দশকে বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদিসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে কলুষিত করা হয়েছে। এসব জায়গায় যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের চরিত্রের সংশোধন কীভাবে সম্ভব, আমার জানা নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঠিক কোন পর্যায় পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে কলুষমুক্ত করা যাবে, তাও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

আজ লিখতে বসে জুলাই বিপ্লবকালীন একটি ভিডিওর কথা মনে পড়ছে। সেই ভিডিওতে এক পুলিশ কর্মকর্তা তৎকালীন আইজি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্বিকারভাবে বলছিলেন, ‘গুলি করলে একজন মরলেও বাকিরা যে রাস্তা ছাড়ে না, সেটাই সমস্যা।’ সমগ্র পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কতজন দানব এ ধরনের নির্মম মানসিকতা নিয়ে আজও কর্মরত আছেন জানি না। অনেক আধুনিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে স্ব-শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে নাগরিকের অধিকারের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মানসিক উন্নয়নের প্রতি অধিকতর জোর দেওয়া হয়।

আমার মনে হয়, আওয়ামী আমলে ভয়ানক শাসনের ‘ট্রমা’ থেকে মুক্তির জন্য রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠানেই উপরোক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করার কথা সরকার বিবেচনা করতে পারে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বের ছয় মাসের দীর্ঘ হানিমুন সমাপ্ত হয়েছে। জনগণ এখন থেকে মেয়াদের বাকি সাড়ে ৪ বছর অব্যাহতভাবে সরকারের পরীক্ষা নেবে। সেই পরীক্ষার বিষয়গুলোর মধ্যে নিশ্চিতভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আশা করি, ক্ষমতাসীন মহলের কারো কারো মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়, সেটি সার্বিক শাসনপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না।

এই বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

সর্বশেষ খবর

ডিবির সেকাল ও একাল

একাদশে ভর্তি আবেদন শুরু আজ, কোটা ৭ শতাংশ

তারেক রহমানের সঙ্গে শিগগিরই সাক্ষাতের প্রত্যাশা ট্রাম্পের

বিএনপি দেশের মানুষের সঙ্গে কখনও বেঈমানি করেনি: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

হঠাৎ বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ

অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে জ্বালানিমন্ত্রী টুকু

‘সংকট থেকে কেবল বিএনপিই দেশকে উদ্ধার করতে পারবে’

স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ চায় জামায়াত

সর্বাধিক পঠিত

‘আসিফ নজরুলের দুর্নীতি?’যা জানা গেল

গত জানুয়ারিতেই সড়কে ঝরেছে ৫৪৬ প্রাণ: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট থাকছে না

শুরু হলো ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সহিংসতা তত বাড়ছে: আসক

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য আজ বিশেষ দিন: ইইউ পর্যবেক্ষক প্রধান

‘এখনো ৪ শতাধিক পিস্তল উদ্ধার হয়নি, এটাই আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ’

সব বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুরু

নতুন পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির বৈঠক আজ, আলোচনায় যেসব ইস্যু

বনানী সামরিক কবরস্থান জিয়ারতে যাবেন জামায়াত আমির