আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি এবং রাষ্ট্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘ভিকটিম ফার্স্ট, অ্যাকশন নাও’ (প্রথমে ভুক্তভোগী, এখনই পদক্ষেপ)।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রেক্ষাপটে দেশের আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর একটি আবারও সামনে এসেছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্যতম। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনকালে ঢাকার উত্তরার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে তার সন্ধান মেলে।
ঠিক কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তার দেশে ফেরার পর এখনো বিস্তারিত প্রকাশ্যে বলেননি তিনি। তবে যে ফ্ল্যাট থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, সেই ফ্ল্যাটের মালিক ও তার ঘনিষ্ঠজন সৈয়দ হাবিব হাসনাত ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
গুলশান থেকে উত্তরায়
২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর আগে ৩ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করা নিয়ে সরকার ও বিএনপি মুখোমুখি অবস্থানে যায়। বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশের প্রস্তুতি নিলে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয় এবং একের পর এক সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিবৃতি দিয়ে আসছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কয়েক দিনের মধ্যে তাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তখন দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সৈয়দ হাবিব হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখপাত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি, গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব ও পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি শুরু করে। তিনি গুলশানের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে অবস্থান পরিবর্তন করে দলের দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার গুলশানে অবস্থানের বিষয়টি জানতে পারে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের পরামর্শে তিনি গুলশান ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সৈয়দ হাবিব হাসনাত তখন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং তার অফিস গুলশানে সালাহউদ্দিনের অবস্থানের কাছাকাছি ছিল। বিকল্প কয়েকটি জায়গার মধ্যে সালাহউদ্দিন তার উত্তরার ফ্ল্যাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে দুপুরে সালাহউদ্দিন ফোন করে দ্রুত গুলশান ছাড়ার কথা জানান এবং হাবিব হাসনাতের উত্তরার ফ্ল্যাটে উঠতে চান। হাবিব তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মতি দেন।
সন্ধ্যার দিকে গাড়ি নিয়ে গুলশানে গিয়ে হাবিব হাসনাত ড্রাইভারকে একটি মিষ্টির দোকানে পাঠিয়ে দেন। এরপর নিজেই গাড়ি চালিয়ে সালাহউদ্দিনের অবস্থান করা বাড়ির কাছে যান। সেখান থেকে সালাহউদ্দিন ও বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল গাড়িতে ওঠেন। উত্তরায় যাওয়ার সময় পুলিশের চেকপোস্ট এড়াতে বিকল্প রুট ব্যবহার করা হয়।
উত্তরার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দারোয়ানকে বিষয়টি বুঝতে না দিয়ে কৌশলে তাকে বাইরে পাঠানো হয়। সেই সুযোগে সালাহউদ্দিন ও তাবিথ আউয়ালকে দ্রুত ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই একজন বাবুর্চি ও সহকারীকে রাখা হয়েছিল। তাদের জানানো হয়, একজন মেহমান সেখানে থাকবেন এবং তার প্রয়োজনীয় সেবাযত্ন করতে হবে।
এরপর হাবিব হাসনাত তার স্ত্রীকে নিয়ে অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান। উত্তরার ওই ফ্ল্যাট থেকেই সালাহউদ্দিন দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি ও ভিডিও বার্তা পাঠাতে থাকেন।
১০ মার্চের ঘটনা
হাবিব হাসনাত জানান, ১০ মার্চ সন্ধ্যার পর তিনি উত্তরার ওই ফ্ল্যাটে যান। এলাকায় ঢোকার পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখতে পান। কিছু সড়কের বাতি নেভানো ছিল, কোথাও গুমোট পরিবেশ এবং আশপাশে মানুষের চলাচল ছিল না। আবাসিক এলাকার দোকানপাটও বন্ধ ছিল। এমনকি সন্ধ্যার পর যে খেলার মাঠগুলোতে তরুণদের নিয়মিত খেলাধুলা করতে দেখা যেত, সেখানেও কাউকে দেখা যায়নি।
বাড়ির কাছে গিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো উপস্থিতি দেখতে পান। বাড়িতে ঢোকার পর দারোয়ানকে মনমরা অবস্থায় দেখেন। ফ্ল্যাটের দরজার কাছে গিয়ে তিনি দেখতে পান দরজা ভাঙা। তাকে দেখে ভেতর থেকে বাবুর্চি ও সহকারী কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসে জানান, ‘মেহমানকে তুলে নিয়ে গেছে।’
হাবিব হাসনাত বলেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন, তাকেও গ্রেপ্তার বা গুম করা হতে পারে। আবার তিনি বাইরে না থাকলে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে কী ঘটেছে, তা জানানোর মতো কেউ থাকবে না। এ কারণে দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তার ভিসা করা ছিল। ওপরের আরেকটি ফ্ল্যাটে থাকা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এক কাপড়ে বিমানবন্দরে চলে যান। সহযোগীদের মাধ্যমে দ্রুত টিকিটের ব্যবস্থা হয়। বিমান দুবাই বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তিনি উত্তরা থানার তৎকালীন ওসির ফোন পান। ওই কর্মকর্তা তাকে খুঁজছেন বলে জানান।
বিদেশে থেকেও নীরব থাকার হুমকি
হাবিব হাসনাত পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এমন একটি এলাকায় ওঠেন, যেখানে বাঙালির সংখ্যা কম। সেখান থেকে তিনি সালাহউদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। বরং তিনি আত্মগোপনে গেছেন—এমন বক্তব্য দেওয়া হতে থাকে।
হাবিব হাসনাত জানান, একপর্যায়ে খালেদা জিয়া অন্য একজনকে দিয়ে তাকে ফোন করিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা দুবাইয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সালাহউদ্দিনকে তার উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে তুলে নেওয়ার কথা জানাতে বলেন। তিনি সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ফোন করে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একটি কথাও বললে তিনি আর কোনোদিন দেশে ফিরতে পারবেন না বলে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। এরপর আর সংবাদ সম্মেলন করা হয়নি।
গুমের আগে গ্রেপ্তার দুই চালক ও ব্যক্তিগত সহকারী
সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়ার আগে ৭ মার্চ তার দুই চালক শফিক ও খোকন এবং ব্যক্তিগত সহকারী ওসমান গণিকে র্যাব গ্রেপ্তার করে। পরদিন ৮ মার্চ সালাহউদ্দিনের খোঁজে গুলশানের ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়। ওই অফিস ও ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন সৈয়দ হাবিব হাসনাত।
এরপর ১০ মার্চ উত্তরার ফ্ল্যাট থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়। এর আগে একাধিকবার তার গুলশানের বাসায় তল্লাশি চালানো এবং বাসার সামনে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা পাহারা বসানোর কথাও জানা যায়।
১৮ মার্চ ঢাকার দুটি জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও নিউ এজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, সালাহউদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই নিয়ে গেছে—এমন তথ্য দিতে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে। যে বাসা থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই এলাকার নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরাও ঘটনার বর্ণনা দেন।
উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের নিরাপত্তাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, সালাহউদ্দিনকে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই বাসার কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি পিকআপ দাঁড়িয়ে ছিল। পিকআপে থাকা সদস্যরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ১৩-বি নম্বর সড়কের অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। পরে বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা জানান, অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারীরা সালাহউদ্দিনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে।
গুমের ঘটনা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য
ঘটনার শুরু থেকেই তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১৪ মার্চ রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সালাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের জন্য তারা খুঁজছেন এবং তিনি কোথায়, তার জবাব খালেদা জিয়াকেই দিতে হবে। একই বক্তব্যে তিনি সালাহউদ্দিনের গুলশানে অবস্থান ও ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ থেকে বিবৃতি দেওয়ার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
এরপর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরাও সালাহউদ্দিন কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন—এমন বক্তব্য দিতে থাকেন।
১৩ মে মেঘালয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সালাহউদ্দিনের সন্ধান পাওয়ার পরও এসব বক্তব্যের রেশ থেকে যায়। ওই দিনই রাজধানীর এক আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, এটি গুম, অন্তর্ধান কিংবা নিখোঁজ নয়; এটি আত্মগোপন। তার দাবি ছিল, আত্মগোপন ও গুম এক বিষয় নয় এবং এই আত্মগোপন দলীয় প্রধানের নির্দেশেই করা হয়েছে।
দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর ভারতের শিলংয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের সন্ধান পাওয়ার মধ্য দিয়ে আলোচিত ওই ঘটনার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আর তার গুম হওয়ার আগে কোথায় ছিলেন এবং উত্তরার ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন সৈয়দ হাবিব হাসনাত।







