নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই। উত্তাল বাংলাদেশ। রাজপথে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন, সংঘাত ও হতাহতের খবর। এর মধ্যেই দেশে বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট। মুহূর্তেই যেন বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
দেশের ভেতরে কী ঘটছে, কোথায় কী পরিস্থিতি—এসব তথ্য জানতে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। অনেকেই দিনের পর দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। একই সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত আপডেট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তথ্য-অবরোধের সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত চার বাংলাদেশি গবেষক ও সাবেক সাংবাদিক নিজেদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সাংবাদিকতার নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু করেন ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা তা পৌঁছে দিতে থাকেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের সমর্থনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করে পাঠাতেন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
তথ্য-অবরোধের সেই সময়ে অনেকের কাছেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন তারা।
এই চারজন হলেন—মোহাম্মদ আলী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. রেজাউল হক (কৌশিক) ও সুমন আলী। বর্তমানে তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে চারজনই বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন।
মোহাম্মদ আলী বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডাকোটায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। অন্য তিনজন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত।
‘দেশে থাকলে আমিও আন্দোলনে শরিক হতাম’
জুলাই আন্দোলনের শুরুতে একের পর এক সহিংসতা ও মৃত্যুর খবর যুক্তরাষ্ট্রে বসেও গভীরভাবে নাড়া দেয় মোহাম্মদ আলীকে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের শুরুতে, বিশেষ করে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর চারদিক থেকে নিহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। তখন আর মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকতে পারছিলাম না। ওই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো আন্দোলনের চিত্র বদলে যায়। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, দেশে-বিদেশে আন্দোলন বেগবান হয়।’
দেশে থাকলে তিনিও আন্দোলনে অংশ নিতেন বলে মনে করেন মোহাম্মদ আলী। তবে হাজার মাইল দূরে বসে কীভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় উদ্যোগটি।
তার ভাষায়, ‘দেশে থাকলে আমিও আন্দোলনে শরিক হতাম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বসে কীভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়, সেটাই ভাবছিলাম। ঠিক তখনই বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন মনে হলো, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য কিছু করা সম্ভব।’
সাংবাদিকতার সূত্রে আগে থেকেই সাজ্জাদ হোসেন, রেজাউল হক কৌশিক ও সুমন আলীর সঙ্গে পরিচয় ছিল তার। চারজনকে নিয়ে খোলা হয় একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। সেখানে শুরু হয় আলোচনা—দূরে থেকেও কীভাবে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রাখা যায়।
মোহাম্মদ আলী জানান, নিজেদের পেশাগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তা সংবাদ আকারে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠানো হতো। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও পাঠানো হতো।
‘রক্তপাত বন্ধে জনমত গড়াই ছিল লক্ষ্য’
দেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল মো. সাজ্জাদ হোসেনকেও। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতার খবর তাকে উদ্বিগ্ন করার পাশাপাশি কিছু করার তাগিদ তৈরি করে।
তিনি বলেন, ‘দেশের সেই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। একটি ন্যায্য দাবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। যারা নিহত হচ্ছিল, তারা আমাদেরই সন্তান, ভাই-বোন কিংবা প্রতিবেশী।’
সাজ্জাদ হোসেনের ভাষায়, তাদের কাজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশে চলমান সহিংসতা ও রক্তপাতের বিষয়ে দেশ-বিদেশে জনমত তৈরি করা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির চেষ্টা করেছি, যাতে এই রক্তপাত বন্ধ হয়। আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, দেশের শিক্ষার্থী, শিশু ও সাধারণ মানুষ যেন এই সহিংসতা থেকে মুক্তি পায়।’
বিবেকের তাড়নায় সংবাদ সংগ্রহ
জুলাইয়ের আন্দোলনের কিছু দৃশ্য এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় রেজাউল হক কৌশিককে। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য কিংবা মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, পানি’—এসব ঘটনা তাকে দূরে থেকেও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তাগিদ দেয়।
কৌশিক বলেন, ‘বিবেকের তাড়নায় আমি ওই সময় জুলাই বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছি। আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি কিংবা “পানি লাগবে, পানি”—এই দৃশ্যগুলো যখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, তখন মনে হয়েছিল, আমাকেও তাদের জন্য, বিপ্লবীদের জন্য কিছু করা দরকার।’
সাংবাদিকতার পুরোনো যোগাযোগই তখন তার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। পরিচিতজন ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। এরপর রাত জেগে সেসব তথ্য যাচাই করে সংবাদ তৈরি করতেন এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠাতেন।
কৌশিক বলেন, ‘আমি আমার পরিচিতজন ও সাংবাদিকদের ফোন করে সংবাদ সংগ্রহ করতাম। পরে রাত জেগে সেসব সংবাদ লিখে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠাতাম।’
তার ভাষায়, ব্যক্তিগত অর্জন নয়, মূল লক্ষ্য ছিল মানুষকে বাঁচানো।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল চাওয়া ছিল যেকোনোভাবেই এই শিশু ও তরুণদের বাঁচাতে হবে, দেশের নিরীহ মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। দেশে যেন কখনো আর এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, এটাই আমাদের চাওয়া।’
‘বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম’
সুমন আলীর কাছে এই উদ্যোগ ছিল সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ কোনো সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না। আমরা শুধু বস্তুনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুলাই বিপ্লবের সমর্থনে যে আন্দোলন হচ্ছিল, সেগুলোর খবরও দেশের গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
তবে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য প্রচারের কারণে বিভিন্ন মহল থেকে হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছিল তাদের।
সুমন আলী বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, পাসপোর্ট বাতিল করা হবে। জুলাই বিপ্লব সফল না হলে হয়তো দেশে ফেরাই কঠিন হয়ে যেত। এমনকি আমাদের পরিবারের সদস্যরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তেন।’
তবুও থামেননি তারা।
সে সময় একটি খণ্ডকালীন চাকরি করতেন সুমন আলী। দিনের চাকরির পাশাপাশি রাতভর সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানোর কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত চাকরিটিই ছেড়ে দেন তিনি।
সুমন বলেন, ‘আমি তখন একটি পার্টটাইম চাকরি করতাম। সারারাত সংবাদ সংগ্রহ ও বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর কাজ করতে হতো। ফলে দিনের চাকরি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত চাকরিটাই ছেড়ে দিই, যাতে পুরো সময় এই কাজ করতে পারি।’
দেশের প্রতি নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সব সময়ের চাওয়া দেশ ভালো থাকুক, দেশের মানুষ ভালো থাকুক। দেশের মানুষ ভালো থাকলেই আমার ভালো থাকা।’
ইতিহাসের নেপথ্যে চার নীরব যোদ্ধা
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে রাজপথের সাহসী মানুষদের কথা থাকবে। থাকবে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের গল্প। তবে ইতিহাসের আরেক প্রান্তে থাকবেন এমন কিছু মানুষ, যারা সামনে না থেকেও নিজেদের অবস্থান থেকে আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন।
মোহাম্মদ আলী, মো. সাজ্জাদ হোসেন, রেজাউল হক কৌশিক ও সুমন আলী ছিলেন তেমনই চারজন।
তারা ছিলেন না বাংলাদেশের রাজপথে। কিন্তু তথ্য-অবরোধের সেই সময়ে দেশের খবর বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে নিজেদের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত সময়কে কাজে লাগিয়েছেন।
স্বীকৃতি, পদ বা পুরস্কারের প্রত্যাশায় নয়—দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায় থেকেই তারা কাজ করেছেন বলে জানান।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সেই অন্ধকার সময়ে তথ্যের প্রবাহ সচল রাখতে তাদের এই উদ্যোগ জুলাই আন্দোলনের নেপথ্যের এক অনুলিখিত অধ্যায়। কারণ, কোনো আন্দোলনের ইতিহাস শুধু রাজপথে লেখা হয় না; কখনো কখনো তা লেখা হয় হাজার মাইল দূরে বসে, একের পর এক ফোনকল, তথ্য যাচাই, রাতজাগা সংবাদ লেখা এবং সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টায়।







