পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে মক্কায় তিন দেশের নেতারা ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ সই করেন। চুক্তির মূল বক্তব্য হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ন্যাটোর অনুকরণে এই ধারা যুক্ত করা হলেও এটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের রূপ পায়নি।
তিন দেশের সামরিক শক্তি
সামরিক সক্ষমতা বিবেচনায় তিন দেশই নিজ নিজ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ২০২৬ সালের গ্লোবার ফায়ারপাওয়ার-এর হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার, তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের ২ লাখ ৪৭ হাজার। অর্থাৎ তিন দেশের সক্রিয় সামরিক সদস্য মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ ৮৮ হাজার।
তবে শুধু সেনাসদস্যের সংখ্যা দিয়ে সামরিক শক্তি বিচার করা যায় না। বিমান, নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা শিল্প, অর্থায়ন, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
আকাশপথে বড় শক্তি
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট সামরিক উড়োজাহাজ প্রায় ১ হাজার ৩৯৭টি। এরমধ্যে যুদ্ধবিমান ৩৩১টি। তুরস্কের মোট উড়োজাহাজ ১ হাজার ১০১টি, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান ২০১টি। সৌদি আরবের মোট উড়োজাহাজ ৯১৭টি, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান ২৮৩টি।
তিন দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতার ধরনও আলাদা। পাকিস্তানের রয়েছে এফ-১৬, জে-১০সি ও জেএফ-১৭-এর মতো যুদ্ধবিমান; তুরস্ক নিজস্ব ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়েছে; আর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উন্নত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় ব্যবহারকারী।
স্থলবাহিনীতে পাকিস্তান-তুরস্কের বড় সক্ষমতা
স্থলযুদ্ধে পাকিস্তান ও তুরস্কের সাঁজোয়া শক্তি উল্লেখযোগ্য। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার বলছে, পাকিস্তানের ট্যাংক সংখ্যা ২ হাজার ৬৭৭টি, আর তুরস্কের প্রায় ২ হাজার ২৮৪টি। সৌদি আরবের ট্যাংক আছে ১ হাজার ৮৫টি।
তবে সৌদি আরবের সামরিক শক্তির বড় বৈশিষ্ট্য হলো উন্নত পশ্চিমা অস্ত্র, বিমান ও বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়। ফলে সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের মানের দিক থেকে দেশটির সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ে এগিয়ে সৌদি
সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে তিন দেশের মধ্যে সৌদি আরব সবচেয়ে এগিয়ে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ছিল আনুমানিক ৮৩.২ বিলিয়ন ডলার। একই বছরে তুরস্ক ব্যয় করেছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তান ১১.৯ বিলিয়ন ডলার। তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২৫.১ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে সৌদি আরব এই সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের রয়েছে তুলনামূলক বড় সক্রিয় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা।
পারমাণবিক শক্তির কারণে পাকিস্তানের আলাদা গুরুত্ব
এই জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল।
যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা
চুক্তির আওতায় তিন দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয় কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও অন্যান্য মানববিহীন ব্যবস্থা নিয়ে যৌথ মহড়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উন্নয়ন, উৎপাদন, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানোর দিকেও এগোবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং মানববিহীন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তাহলে জোটটি কতটা শক্তিশালী?
সামরিক শক্তির সংখ্যাগত হিসাবে পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি জোট নিঃসন্দেহে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি। তিন দেশের সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ১২ লাখ ৮৮ হাজার। তাদের হাতে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। এর সঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা, তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সৌদি আরবের বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট যুক্ত হয়েছে।
তবে কাগজে-কলমের সামরিক শক্তি আর বাস্তব যৌথ যুদ্ধক্ষমতা এক বিষয় নয়। তিন দেশের অস্ত্রব্যবস্থা, কমান্ড কাঠামো, ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত অগ্রাধিকার ভিন্ন। ফলে যৌথ কমান্ড, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিকস ও আন্তঃবাহিনী সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়—তার ওপর এই জোটের প্রকৃত সামরিক শক্তি অনেকটাই নির্ভর করবে।







