ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীকে কার্যালয়ে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ ও সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবিতে সন্ধ্যা থেকে কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় আট ঘণ্টা অবস্থানের পরও ফুটেজ প্রকাশ না করায় সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত ৩টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রাধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে নিতে গেলে শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নেতারা বাধা দেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম ও জিএস ইমামুল হাসানসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত অন্যদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। পরে আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এর আগে. গত ৯ আগস্ট হলের প্রাধ্যক্ষের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট শেয়ার করেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম। তিনি রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ওই পোস্টের জেরে গতকাল তাকে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন, মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং জোরপূর্বক লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুনের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল রাত ৭টার পর হল কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এতে ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের নির্বাচিত নেতাকর্মী, ডাকসুর নেতা-কর্মী, ছাত্রশিবির নেতাকর্মী এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারাও অংশ নেন।
পরে হল সংসদ ও ডাকসুর পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি জানায়। সাক্ষাৎ শেষে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, ইচ্ছে করেই প্রাধ্যক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে আনতে রাতে সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং এবং কয়েকজন সহকারী প্রক্টর। সিসিটিভি প্রকাশ না করা এবং সমাধানের চেষ্টা না করার অভিযোগে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদেরও কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে দুই প্রো-ভিসি সেখান থেকে বের হয়ে যান। এ সময় প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের গেটে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাংয়ের সঙ্গে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাত পৌনে ৩টার দিকে ছাত্রদলের একটি দল শিবিরবিরোধী স্লোগান দিতে দিতে মিছিল নিয়ে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসে। মিছিলটি দেখে হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম বলেন, ‘শহীদুল্লাহ হলের সন্ত্রাসীরা এখানে কী করছে?’ এরপরই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ভিপি আবু নাঈমসহ সেখানে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ভিপি ও জিএসসহ অন্তত ছয়জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাংও ধাক্কা খেয়ে একটি পিলারের সঙ্গে পড়ে যান। পরে ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী তাকে ঘিরে সেখান থেকে বের করে নিয়ে যান। হামলার পর হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসানকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় ভিপি আবু নাঈমের গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যায়। পরে আহতদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হল প্রাধ্যক্ষকে কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
প্রাধ্যক্ষকে নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাঁধা দেয় এমন অভিযোগ করে উপস্থিত সাংবাদিকরা। তবে ঢাবি ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি তামি বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের ভিডিও ধারণে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, অন্যান্য হল থেকে শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে এসেছিলেন। পরে ভিপি-জিএসদের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে যান।
ছাত্রদলের নেতৃত্বে প্রভোস্টকে বের করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেতরে যাইনি। হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়েছিল।
অন্যদিকে, ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইব্রাহিম বলেন, হলের শিক্ষার্থীরা প্রথমে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চেয়েছিলেন। ফুটেজ দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যেত প্রভোস্ট কীভাবে দরজা বন্ধ করে আমাকে হেনস্তা করেছেন। সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ২টা পেরিয়ে গেলেও ফুটেজ দেখানো হয়নি।
তিনি বলেন, প্রথমে জানানো হয়েছিল, মিডিয়া বা অন্যান্য হলের শিক্ষার্থীরা ফুটেজ দেখতে পারবেন না; শুধু তিনি, হল সংসদ এবং ডাকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি তা দেখতে পারবেন। কিন্তু শিক্ষকরা বারবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার কথা বলে বিষয়টি পিছিয়ে দেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা অফিসের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ইব্রাহিমের অভিযোগ, এরপর ঘটনাটি ‘চিরাচরিত প্রথা’ অনুযায়ী ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তার দাবি, উভয় পক্ষই অন্যান্য হল থেকে নিজেদের লোকজন নিয়ে আসে। এর মধ্যে তিনি নিজেই বিচারবঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল আমার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এফএইচ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবিদ হাসনাতের নেতৃত্বে কমিটির আরও কয়েকজন মিলে অভিযুক্ত প্রভোস্টকে গার্ড দিয়ে বের করে নিয়ে গেছে। আমি বিচার চেয়েছিলাম, সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চেয়েছিলাম। অথচ এখনো বিচার পাচ্ছি না।
উল্লেখ্য, প্রাধ্যক্ষের কক্ষে শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনায় সন্ধ্যা থেকেই প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে।







