বিদ্যুৎ সংকট সরকারের অব্যবস্থাপনার ফল: নাহিদ ইসলাম

Post Image

দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে সরকারের পরিকল্পনাহীনতা, জ্বালানি ক্রয়ে সিদ্ধান্তহীনতা এবং ভুল অগ্রাধিকারের ফল বলে অভিযোগ করেছন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ ও অস্থিরতা সংকটকে আরও তীব্র করেছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শুধু যুদ্ধ বা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে দায়ী করা যায় না।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কথা তুলে ধরে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে।

ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর পর অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫ থেকে ৯০ ডলারে উঠলেও সরকার যথাসময়ে মূল্য সমন্বয় করেনি। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হলেও এর পাশাপাশি ভর্তুকির বাড়তি চাপ মোকাবিলায় অর্থায়ন পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা না থাকায় মার্চে বিদ্যুৎ বিভাগ অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেয়।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ভর্তুকির চাপ সামলাতে সরকার এমন জায়গায় ব্যয় কমিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়েছে। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানিকৃত বিদ্যুতের অর্থ পরিশোধে সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বকেয়া অর্থের কারণে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারেনি, কয়লার সরবরাহে সমস্যা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ আমদানিও কমেছে।

তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ বা আইপিপির ফিক্সড পেমেন্টের মতো খাতে কাটছাঁট না করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতে অর্থ সংকোচন করা হয়েছে। তার ভাষায়, এটি অর্থ সাশ্রয় নয়; বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতা।

চলমান সংকটে কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার ঘাটতিও রয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার দাবি, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা থাকার কথা। অথচ একই সময়ে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি অর্ধেকে নেমে আসে, আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যায় এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমে যায়।

নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ভারত থেকে ডিজেল, ঝাড়খণ্ড থেকে আদানির বিদ্যুৎ এবং ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে কয়লা আমদানির কোনোটি হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল নয়। তাহলে এসব সরবরাহ কেন কমেছে, তার ব্যাখ্যা সরকারকে দিতে হবে। তার মতে, এর পেছনে যুদ্ধের চেয়ে বকেয়া অর্থ, ক্রয়-সূচি এবং জ্বালানি পরিকল্পনার ঘাটতি বড় কারণ।

জ্বালানি সংকটের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, মূল্য সমন্বয়ের আগে পাম্পগুলোতে জ্বালানি না পাওয়ায় দীর্ঘ লাইন তৈরি হলেও দাম বাড়ানোর পরপরই সেই লাইন চলে যায়। এতে সংকটের একটি অংশ মজুত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তিনি মনে করেন। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অপরিশোধিত তেল কেনার শিডিউল পিছিয়ে দেওয়া এবং একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চিঠির পর দ্রুত বেসরকারি আমদানি নীতিমালার খসড়া চাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, সংকট মোকাবিলা না করে সংকটকে বেসরকারিকরণের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের মাত্রা তুলে ধরে তিনি পিজিসিবির তথ্যের বরাত দিয়ে বলেন, এপ্রিল ২০২৬-এ সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ছিল ৪১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা এবং জুলাইয়ে তা ছিল ৩২ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা। আগস্টে তা বেড়ে ৫৩ হাজার থেকে ৬২ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে বলে তিনি দাবি করেন। ১০ আগস্ট রাত ১টার দিকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও করেন এনসিপির এই নেতা।

নাহিদ ইসলাম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে, এটি সত্য। তবে যুদ্ধই সংকটের মূল কারণ নয়। সরকারের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতিই সংকটকে এতটা ভয়াবহ করেছে বলে তিনি দাবি করেন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নথি থাকা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এগুলো হলো ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান। তার মতে, ফুয়েল প্ল্যানে কোন মাসে কী পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, কখন অর্ডার দিতে হবে এবং কত অর্থের প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারিত থাকার কথা। এসব পরিকল্পনা হালনাগাদ থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হতো বলে দাবি করেন তিনি।

সোলার খাতেও সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, সোলার হোমের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে ১৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং বড় ও ছোট ব্যবসার মধ্যে বৈষম্য করা হয়েছে।


বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর অতীত দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের মে পর্যন্ত তিনি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ওই সময়ে দেশের মানুষ নিয়মিত লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। প্রায় দুই দশক পর একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসে কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ।

এটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং পারফরম্যান্সের প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এমন অস্থির সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

এদিকে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ ও করিডোর নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় ৭৬৫ কেভি কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর সঞ্চালন লাইন এবং ভারতের সঙ্গে ‘পাওয়ার কানেক্টিভিটি’ নিয়ে সক্রিয় হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত করিডোরের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়। বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বিদ্যুৎ অরুণাচল প্রদেশের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পরিকল্পিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আসতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।

যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশের স্বাদু পানির অন্যতম প্রধান উৎস উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গঙ্গায় ফারাক্কা ও তিস্তায় গজলডোবার অভিজ্ঞতার পর যমুনার উজানে একই ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশ মেনে নিতে পারে না। ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে আপত্তি না থাকলেও নদীর ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহ ধরে বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলেপল্লির মাছ ধরার ট্রলারগুলো সাগরে যেতে পারছে না এবং অধিকাংশ বরফকল বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানা, সেচ, শিক্ষা ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শেষে সরকারকে এনসিপির দেওয়া সমাধান প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে যমুনা নদীর পানির ভবিষ্যৎ রক্ষায় ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ করিডোরের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

রাজনীতি

সর্বশেষ খবর

ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইলেন ছাত্রদল নেতা রাকিব

বিদ্যুৎ সংকট সরকারের অব্যবস্থাপনার ফল: নাহিদ ইসলাম

তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের পর ছাত্রদল সভাপতির বার্তা

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ

চেয়ারম্যান থেকে ‘মহামান্য’—মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অভিযাত্রা

দলীয় পদ ও মন্ত্রিত্ব থেকে মির্জা ফখরুলের পদত্যাগ

আসিফ মাহমুদের বাবার লাইসেন্স বাতিলের স্মৃতি বনাম সালাহউদ্দিনের ছেলের সেতু প্রজেক্ট নিয়ে নীরবতা

খাস জমিতে মহিষ চরাতেও দিতে হয় চাঁদা

সর্বাধিক পঠিত

ছাত্রদল নেতা নাসির উদ্দিনকে অব্যাহতি

হান্নান মাসউদকে ১০ লাখ টাকার সহায়তা দিল সহপাঠীরা

দীর্ঘ বিশ বছর পর চট্টগ্রামে তারেক রহমান

নামের সিরিয়াল নিয়ে বাগবিতণ্ডা, যুবদল কর্মীর মারধরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার মৃত্যু

১৯ বছর পর বগুড়া যাচ্ছেন তারেক রহমান ‎

জাতীয় পার্টিকে ভোটে অংশ নিতে দেয়া এজেন্সির খেলা: আখতার

বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় যারা

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে রাজধানীতে শিবিরের বিক্ষোভ

ইরানের হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ, ক্ষতিপূরণের ৩৯ হাজার আবেদন ইসরায়েলে

জুলাই চেতনা বাস্তবায়নে হ্যাঁ ও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন: জাহিদুল