আগামী মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন। এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে। তবে, তারেক রহমান যোগ দেবেন কি-না সেই বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে জানানো হয়নি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস। আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের নেতাদের সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তবে বুধবার পর্যন্ত এই সম্মেলনে তারেক রহমানের যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম।
গত সোমবার তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন যে ওই সম্মলনে যোগ দিতে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি-না। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, এই বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
পরদিন মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ব্রিফিং করেন। সেখানেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন- এ নিয়ে কোনো আপডেট থাকলে সেটি তিনি জানাবেন।
সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল সেটি কাটিয়ে উঠতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই চেষ্টা ছিল।
তারা বলছেন, চলতি বছরের পাঁচই অগাস্ট নয়াদিল্লিতে বসে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দুই দেশের মধ্যে আবারো কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে ঠিকই। তবে, তারেক রহমান যদি ভারত সফরে যান তাহলে সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক সচিব মাশফি বিনতে শামস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে ঠিকই, তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তারেক রহমানের এই সফরে যাওয়া উচিত।
তারেক রহমানের সফর নিয়ে ধোঁয়াশা কেন?
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য দেশ নয়।
তবে ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের নেতাদের সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এই আঞ্চলিক জোট হচ্ছে বিমসটেক বা বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন।
বিভিন্ন সময়ে সদস্য দেশগুলোর সরকার প্রধানেরা বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সাল থেকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদটি রয়েছে বাংলাদেশের। সেই হিসেবে বর্তমান এই জোটের চেয়ারম্যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। গত জুলাইয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এরপরই গত প্রায় এক মাস ধরে এই আলোচনাটি চলছে যে, ওই সম্মেলনে অংশ নিতে ভারত সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাবেন কি-না।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরে বলা হয়, এই সফরে তারেক রহমান না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে এখনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত সোমবার বলেন, "প্রধানমন্ত্রীকে না, চেয়ারপারসন অব বিমসটেক দাওয়াত দেওয়া হয়েছে"।
তিনি আরও বলেছেন, "এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছেন এবং সেই চিঠিটি আমাদের সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ একটা আছে সেখানে, সেটা আমরা দেখব কোনো এক সময়ে"।
গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের পর ওইদিনই ভারতে যান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
মঙ্গলবার ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মুখোমুখি হন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।
তার কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যেতে রাজি হয়েছেন কি না। জবাবে মি. জয়সওয়াল বলেন, "দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সেই সঙ্গে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশগ্রহণের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য থাকলে আমরা আপনাদের জানাব"।
অর্থাৎ ভারত সরকারের কাছেও এখনো এমন কোন বার্তা যায়নি যে তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে যাবেন কি-যাবেন না।
তবে সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, এই সফরে যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর যান এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয় তাহলে এই সফরে বাংলাদেশের যাওয়া উচিত সম্পর্কের ইতিবাচক উন্নয়নে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এমন যদি হতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন। পরের দিন ব্রিকসের আউটরিচে অংশ নিলেন, এটা হলে পারফেক্ট হতো। কেননা, ব্রিকসে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। সেদিক থেকে এই সফর বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ"।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছিল। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও ভিসা বন্ধের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। সে সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল নির্বাচিত সরকার আসলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে দুই দেশের মধ্যে।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক দিকেই এগোচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনা এই সম্পর্ক এই সম্পর্ককে আবার পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে গত পাঁচই অগাস্ট নয়াদিল্লিতে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা আসার পরই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটি নিয়ে উদ্বেগও জানানো হয়েছিল।
তবে, শেষ পর্যন্ত সেখানে অনলাইনে উপস্থিত থেকে শেখ হাসিনা অডিও বক্তব্য দেওয়ার পরই এ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও জানায় বাংলাদেশ। পরদিন ভারতের রাষ্ট্রদূতের সাথে এ নিয়ে বৈঠকও করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি (শেখ হাসিনা) আবার সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যও রেখেছেন, এবং সেটা যাতে না রাখতে পারে সে বিষয়ে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে"।
তবে এই কূটনীতিক এটিও মনে করেন যে, শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া বা এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। তাতে সম্পর্কে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়তো না।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাশফি বিনতে শামস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পারিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। সেক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পারিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলো"।
অভ্যন্তরীণ কারণও গুরুত্বপূর্ণ
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটানা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ে নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধীপক্ষগুলোর নানা অভিযোগ ছিল। তবে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সমর্থন দেখা গিয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রতি।
যে কারণে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ ভারতবিরোধী অবস্থানটি আরো প্রকাশ্যে আসে। সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হয়। মিছিল সমাবেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী নানা স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও মাঠের রাজনীতিতে ভারত বিরোধী অবস্থান আরো বেশি স্পষ্ট করে।
কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াত এনসিপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভারত বিরোধী অবস্থানের কারণে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভারত সফরের বিষয়ে বেশ সতর্ক। বিরোধীপক্ষের এই অবস্থানের ভারত সফর বিষয়টি এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।
কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই মুহূর্তে যারা বিরোধী দলে অর্থাৎ সংসদে অবস্থান করছে, তারা সম্ভবত কিছুটা কট্টরপন্থি। তাদের এই অবস্থানের কারণে, সরকার হয়তো অতটা সাহস পাচ্ছেন না এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রো-ইন্ডিয়ান একটা সিদ্ধান্ত নিতে"।
তবে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে আবার এই সফরটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সাবেক কূটনীতিকরা।
নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশতো ব্রিকসের সদস্য হতে ইচ্ছুক। সেখানে গেলে এই ধরনের এনগেজমেন্ট সহজেই ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণকে আরো শক্তিশালী করবে"।
তিনি মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার জন্য হলেও এই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ।
আর সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মত হলো, শুধু সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়, যদি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয় ভারতের সাথে তাহলেই কেবল ভারত সফরে যাওয়া উচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।







