দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ঘাটতি বেড়ে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গত এক মাসে ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন (৩১৩ কোটি) ডলার। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম আট মাসে দেশের রপ্তানি আয় ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। রমজানকে কেন্দ্র করে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পোশাকসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের অর্ডারে। এর ফলে তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে এবং বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন (১ হাজার ৬৯১ কোটি ৩ লাখ) ডলার। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৩৭৭ কোটি ৯ লাখ) ডলার। সেই হিসাবে এক মাসে (ফেব্রুয়ারি) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন (৩১৩ কোটি) ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। ফলে এ খাতে অর্ডার কমে গেলে সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও প্রভাব
পড়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংকট, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) নতুন রেকর্ড হয়েছে। এই মাসে দেশে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। এই আয় গত বছরের মার্চে আসা প্রবাসী আয়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। দেশে রমজানের ঈদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের প্রবাসী নাগরিকরা বেশি করে অর্থ পাঠিয়েছেন। তাতে দেশে কোনো এক মাসে প্রবাসী আয়ের নতুন রেকর্ড হয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লেও এখন পর্যন্ত প্রবাসী আয় আসার গতি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এর আগে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছিল গত বছরের মার্চে। তখন প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন মোট ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। সে তুলনায় এবারের মার্চে প্রবাসী আয় ১৪ শতাংশ বেশি এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূলত আমদানি বাড়া ও রপ্তানি কমার কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে একই সময়ে দেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব মার্চ মাস থেকে আরও স্পষ্ট হতে পারে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বাণিজ্য চুক্তি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। তারা বলেন, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতেও বাণিজ্য ঘাটতির চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে দেশের আর্থিক হিসাবে প্রায় ৪ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।







