ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর দেশটি এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা, প্রতিশোধের অঙ্গীকার এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে— এখন কোন পথে হাঁটবে তেহরান? সংঘাত কি আরও বিস্তৃত হবে, নাকি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন কৌশল নেবে ইরান? সংঘাতের এই মুহূর্তে ইরানের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়েই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, রাজধানী তেহরানে অবস্থিত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন চত্বরে ডজনখানেক বোমা হামলার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। ‘বেইত-এ রাহবারি’ বা (নেতৃত্বের বাসভবন) নামে পরিচিত এই কমপ্লেক্সটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিকের লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি ছিল।
৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি বিভিন্ন বক্তৃতায় শহীদ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। হামলার উচ্চ ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি শেষ কয়েক দিন পরিবারসহ সেখানেই অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
এরপর অনলাইনে খামেনির মৃত্যুকে ঘিরে শোক ও উল্লাসের নানা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলোর সত্যতা যাচাই হয়েছে, তবে ইরানে ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে বন্ধ থাকায় দেশটির মানুষ কতটা সেগুলো দেখতে পারছেন, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমর্থকদের শোকসভা সম্প্রচার করা হচ্ছে। সরকারিভাবে ৪০ দিনের শোক এবং এক সপ্তাহের কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।
শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বও নিহত
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, প্রতিরক্ষা পরিষদের এক বৈঠকে খামেনির পাশাপাশি আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুলরহিম মুসাভি।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ক্ষমতা হস্তান্তর তদারকির জন্য শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হবে। তিনি আরও বলেন, ইরান প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকবে।
রোববার দেয়া এক বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রতিশোধের অঙ্গীকার করে জানায়, খামেনির নির্ধারিত পথেই এগিয়ে যাবে তারা। পরে তারা ঘোষণা দেয়, ‘এই অঞ্চলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির বিরুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান শিগগিরই শুরু হবে।’
যুদ্ধের গতিপথ কি বদলাবে?
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, খামেনির হত্যাকাণ্ড স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে না। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কোনও নেতা বা নেতৃত্বকে হত্যা করলেই সঙ্গে সঙ্গে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে, এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল গভর্ন্যান্স সেন্টারের এই গবেষকের মতে, প্রায় দেড় মাস ধরে সম্ভাব্য উত্তেজনার জন্য ইরান প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং গত বছরের জুনের ১২ দিনের সংঘাত থেকে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াও ছোট ছোট সামরিক ইউনিট পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালাতে সক্ষম।
তিনি বলেন, ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামো এখনও কার্যকর রয়েছে।
আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা
বর্তমান সংঘাত শুরুর আগেই ইরান তাদের কৌশল ঘোষণা করেছিল। আর তা হচ্ছে— মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যুদ্ধ ও বিস্ফোরণের আগুন জ্বালিয়ে দেয়া। আর যুদ্ধ শুরুর পর ইরান তার সেই কৌশল বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে।
ইরান শুধু কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়নি, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তেল স্থাপনা এবং দুবাইয়ের মতো জনবহুল নগরীতেও আঘাত হেনেছে।
সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নের প্রভাষক আরমান মাহমুদিয়ান বলেন, ‘তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক শক্তির ওপর প্রাধান্য দেখাতে পারবে, এমন বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট নেই’। তবে যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলাই ইরানের লক্ষ্য হতে পারে।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক সারা কারমানিয়ানের মতে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত করা বা ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করা এই কৌশলের অংশ হতে পারে।
মূল্য অনেক বেশি, তবু টিকে থাকার লড়াই
সামরিক সক্ষমতার অসমতার কারণে ইরানের জন্য যুদ্ধের মূল্য খুব বেশি হতে পারে। তবু কৌশলগতভাবে দেশটির সহনশীলতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কারমানিয়ান বলেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই করছে। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হওয়ায় মানবিক বা আর্থিক ক্ষতি নিয়ে তাদের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপও তুলনামূলক কম।’
তার মতে, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছাড়া যদি ইরান সংঘাত টিকে যায়, সেটিকেই কৌশলগত সাফল্য বলা যেতে পারে। বিপরীতে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি আরও বড় হামলার পথে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও নজিরবিহীন শক্তি প্রয়োগ করবে।
ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, ‘ইরান বলেছে তারা আগের চেয়ে বেশি জোরালো হামলা চালাবে। তারা যেন তা না করে। করলে আমরা এমন শক্তি প্রয়োগ করব, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’
এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা আরও বাড়বে নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রভাবশালী মহলের মধ্যে আলোচনার পথ খুলবে তা এখনো অনিশ্চিত।







