দিনের পর দিন তীব্র গ্যাস সংকটে ত্যক্ত-বিরক্ত রাজধানীর দনিয়া এলাকার বাসিন্দা দিলরুবা আক্তার। বাধ্য হয়ে কিনেছেন বৈদ্যুতিক চুলা, সঙ্গে আছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। মাঝেমধ্যে এলপিজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে কিংবা বিদ্যুৎ না থাকলে ছাদে গিয়ে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হয় তাকে। এত ঝক্কি-ঝামেলা আর বাড়তি ব্যয়ের পরও প্রতি মাসে ঠিকই তিতাসের নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
দিলরুবার মতো এমন ভুক্তভোগী অসংখ্য। এর মধ্যে আবার যাদের বাড়তি ব্যয়ের সামর্থ্য নেই, তাদের কখনো গভীর রাতে, আবার কখনো কোনোমতে একবেলা রান্না করে দুই দিন ধরে সেই খাবার খেতে হচ্ছে। সময় মেলাতে না পেরে রেস্তোরাঁর খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছেন অনেকে।
দীর্ঘদিন ধরে এমন সংকটের মধ্যে গত মঙ্গলবার একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বেশিরভাগ এলাকায় দিনের বড় অংশ জুড়ে চুলা জ্বলছে না, সিএনজিচালিত যানবাহনও পড়েছে বিপাকে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট পেলে মোটামুটি সংকট এড়ানো যায়। কিন্তু স্থানীয় ও আমদানি করা এলএনজি মিলে সরবরাহ করা হয় গড়ে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে যাওয়া জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।
তিতাসের নিজস্ব অভিযোগ কেন্দ্রেও অভিযোগের পাহাড় দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গ্যাসের স্বল্প চাপের জন্য ১৬৬টি এবং গ্যাস না থাকার জন্য ১১৫৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ১৭৫টি এবং ১৬৫০টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অভিযোগ আরও বেড়ে ২৫২টি এবং ২২৭৪টিতে দাঁড়িয়েছে। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব পাওয়া যায়নি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগের বছরের চেয়ে অভিযোগের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সেক্ষেত্রে গ্যাসের স্বল্প চাপ এবং গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ অন্তত ৩ হাজার। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ বেশিরভাগ মানুষই তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে অভিযোগ করেন না। আবার অনেকেরই এখন গা সয়ে গেছে। অন্যান্য বিতরণ কোম্পানির ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা।
গ্যাস না দিয়েই বিল আদায়: বাসাবাড়িতে এমনিতেই বাড়তি ব্যবহার ধরে বিল আদায় করে বিতরণ সংস্থাগুলো। এর ওপর আবার বেশিরভাগ সময়ই গ্যাস পান না গ্রাহকরা। কিন্তু প্রতি মাসে নির্ধারিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শ্যামলীর বাসিন্দা লিজা আক্তার জানালেন, ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না, আবার মাসে মাসে বিল দিতে হবে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে কবে?
গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছেন। সেখানে বক্তারা দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত সরবরাহ না দিয়েও বিল আদায় বন্ধের দাবি জানান।
বিতরণ সংস্থাগুলো গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস কিনে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। মিটারের মাধ্যমে যে পরিমাণ গ্যাস পায়, সে অনুযায়ী বিল পরিশোধ করে। অর্থ্যাৎ কম গ্যাস পেলে কম বিল, বেশি পেলে বেশি বিল দেয়। কিন্তু গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত বিল আদায় করে। এতে বিপুল পরিমাণ বাড়তি বিল আদায় করছে বিতরণ সংস্থাগুলো।
বাড়তি বিল আদায়ের সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে যে ধারণা পাওয়া গেছে, তাতে বাসাবাড়িতেই বছরে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে বিতরণ সংস্থাগুলো। কারখানা ও অন্যান্য খাতের হিসাব বিবেচনায় নিলে এর পরিমাণ আরও বেশি।
গ্যাস না দিয়ে বিল আদায় করা অন্যায় ও অযৌক্তিক বলে মনে করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী। তিনি আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, গ্যাস বিল না দিলে বিতরণ সংস্থা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে। কিন্তু গ্যাস না দিলে বিল পাবে না— এমন কথা গ্যাস সংযোগের শর্তের মধ্যে রাখেনি বিতরণ সংস্থাগুলো।
এ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বললেন, তিনি কমিশনে থাকার সময় একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন তিন গ্রামের বাসিন্দারা। সেখানে বলা হয়, দুই বছর ধরে কোনো গ্যাস না দিয়েও তিতাস তাদের কাছে বিল দাবি করছে। সব তথ্য-প্রমাণ পেয়ে আমি বিল না দেওয়ার পক্ষে রায় দিলাম। এই রায়ের বিরুদ্ধে পরে উচ্চ আদালতে রিট করে তিতাস। যত দূর জানি, সেটি এখনো বিচারাধীন।
স্মার্ট প্রিপেইড মিটার: গ্যাসের অপচয় ও চুরি রোধসহ নানান সুবিধা বিবেচনায় ২০১১ সালে বাসাবাড়িতে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ শুরু হয়। পরিকল্পনা ছিল ২০২৪ সালের মধ্যে সব আবাসিক গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিভিন্ন সময় প্রিপেইড মিটার বসানোর নির্দেশ দিয়েছে। ২০১৫ সালের ট্যারিফ আইনে বিতরণ সংস্থাগুলোকে প্রিপেইড মিটার প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশ দেয় বিইআরসি।
কিন্তু এখন পর্যন্ত ৩০ লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে মাত্র ৬ লাখ সংযোগ প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছে।
গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তাদের প্রথাগত বিলিং ব্যবস্থার বদলে প্রিপেইড মিটার চালুর পর গ্রাহকের গ্যাস ব্যবহারের মাসিক খরচ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে একাধিক ব্যবহারকারী জানান।
সাশ্রয়ী হওয়ায় গ্রাহকরা প্রিপেইড মিটারে আগ্রহী হলেও বিতরণ সংস্থাগুলো তা স্থাপনে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করেছে।
বর্তমানে দেশে আবাসিক গ্যাস গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার। যার মধ্যে তিতাস গ্যাসের আওতায় প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার, চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্ণফুলী গ্যাসের ১ লাখ ৬০ হাজার, সিলেট অঞ্চলে জালালাবাদ গ্যাসের আওতায় প্রায় ৫০ হাজার প্রিপেইড মিটার গ্রাহক রয়েছেন। অর্থাৎ বেশিরভাগ গ্রাহকই এখনো এই সুবিধার বাইরে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দুটি প্রকল্পের আওতায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার এবং এডিবির অর্থায়নে সাড়ে ৬ লাখ প্রিইপেইড মিটার স্থাপনের চলমান প্রকল্প বাতিল করেছে সরকার। এসব প্রকল্পে এরই মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রিপেইড মিটার নিয়ে গত ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এক সভায় বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে এই প্রকল্প বাতিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
পরে ১২ মে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠিতে ওই সভার সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, গ্যাসের স্মার্ট মিটার কেনার জন্য বৈদেশিক ঋণ, প্রকল্পগুলোর ‘নেতিবাচক আইআরআর’ (অর্থনৈতিক অলাভজনকতা), দেশীয় গ্যাসের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন হ্রাস, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সংকট এবং স্মার্ট মিটারের মাসিক ভাড়া ইত্যাদি পর্যালোচনা করে প্রকল্পগুলো বাতিল করা হয়েছে।
এডিবির সেফগার্ড ডকুমেন্টের তথ্যমতে, প্রিপেইড মিটার বসলে গ্যাস সাশ্রয় হবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমবে। তিতাসের নিজস্ব সমীক্ষায়ও বলা হয়েছিল, মিটার বসলে আবাসিক গ্রাহকপ্রতি মাসে গড়ে ২৬ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হতো।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে নেওয়া তিনটি গ্যাস প্রিপেইড মিটার প্রকল্প বাতিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পাইপলাইনে গ্যাসই নেই, নতুন কোনো কূপ খনন বা গ্যাস উত্তোলন করা হয়নি, অথচ নতুন করে কোটি কোটি টাকা ঋণের বোঝা বাড়িয়ে প্রিপেইড মিটার লাগানো হচ্ছে। এ যেন ঘোড়া নেই, চাবুক কেনার মতো অবস্থা।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোর সমালোচনা করে মন্ত্রী বললেন, ‘বিগত সরকারের আমলে জনস্বার্থে কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি, সবই ছিল ব্যক্তিগত লাভের জন্য। তারা দেশের জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করে গেছে। দেশের মানুষ অলরেডি ব্লিডিং করছে। প্রত্যেকের মাথার ওপর প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের দায় চেপে আছে। আমি আর নতুন কোনো ঋণের ফাঁদ তৈরি করতে চাই না। জনস্বার্থেই এই প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বললেন, প্রত্যেকের বাসাবাড়িতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হলে চুরি বন্ধ হবে। চোরদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এখানে গ্রাহকের সুবিধা দেখা হয়নি। তিনি বললেন, ‘বাসাবাড়িতে ৩৫ থেকে ৪০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হয়। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলো ৫৫ থেকে ৬০ ঘনমিটার হিসাব করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না দিয়েও বিল আদায় করছে। একসময় এটি ১১০ ঘনমিটার ছিল। পরে ৭৮ ঘনমিটার এবং আমি যখন কমিশনে ছিলাম তখন তা ৬০ ঘনমিটারে নামিয়ে আনা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তা ৫০ ঘনমিটারে নামানোর কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।’
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন: গ্যাস সংকটে পরিবহন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর অনেক পাম্পে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ এতই কম যে, গাড়িতে গ্যাস নিতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েকগুণ বেশি সময় লাগছে।
গত বুধবার থেকে স্টেশনগুলোর সামনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছে ব্যক্তিগত গাড়ি। পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের গাড়িও আছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
ঢাকা জেলা সিএনজিচালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বললেন, দিনের বড় একটি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কাটাতে হচ্ছে। গ্যাস না পাওয়ায় অনেক চালক দৈনিক জমার টাকাও তুলতে পারছেন না। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বললেন, একটি স্টেশন চালাতে অন্তত ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ স্টেশনে গ্যাসের চাপ ১, ২ বা শূন্য। তাই গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি অপেক্ষা করছে। কোনো কোনো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে।







