টানা কয়েক দিনের অতিভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ছয় দিনের ব্যবধানে পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে বা ডুবে শিশু ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে সব সাইক্লোন শেল্টার (আশ্রয়কেন্দ্র)।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১৬ জন পাহাড়ধসে এবং তিনজন পানিতে ভেসে বা ডুবে মারা গেছেন। এর মধ্যে শুধু উখিয়ায় বুধবার পাহাড় ধসে অন্তত ৮ জন মারা গেছে, যার মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষার্থী। অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে।
পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিকূল আবহাওয়া আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১২৯ মিলিমিটার, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৭৭ মিলিমিটার এবং আরও আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিন দিনে মোট ৬৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ।
গত ছয় দিনে জেলায় মোট ৭৪৯ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বল্প সময়ে এমন অতিভারী বৃষ্টিপাত পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ রয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকার অন্তত ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। রামুর অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে, তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশ, পাহাড়ের ঢাল এবং বন্যাকবলিত নিচু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহবান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কক্সবাজারে বর্ষা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, খাল-নালা ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জেলা প্রশাসন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার, অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহবান জানিয়েছে।





