৩ জুলাই ২০২৪: ধর্মঘটে উত্তাল দেশ, ছাত্রলীগের হামলা

Post Image

আদালতের রায়ে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের পর নতুন করে শুরু হওয়া কোটা বাতিলের দাবিতে ধর্মঘটে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই সারা দেশ উত্তাল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। রাজধানীসহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হল ফটকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালান। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল করে তা আইনে পরিণত করাসহ চার দফা দাবি জানান এবং পরদিন ৪ জুলাই বেলা ১১টায় সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সেদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-বরিশাল, খুলনা-ঢাকা, খুলনা-যশোর ও খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে স্থবির হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচল। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ করে ট্রেন থামিয়ে দেন এবং টানা দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে কোটা পদ্ধতি বহালের দাবিতে দু-এক জায়গায় কর্মসূচি পালিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল থেকে আলাদা মিছিল বের হয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে একত্রিত হয়। দুপুর থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত সাত কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এরপর সম্মিলিত মিছিলটি হলপাড়া, ভিসি চত্বর ও টিএসসি ঘুরে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে অবস্থান নেয় শাহবাগ মোড়ে। এ সময় ‘সারা বাংলায় খবর দে- কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দালালি না রাজপথ- রাজপথ রাজপথ’, ‘জেগেছে রে জেগেছে- ছাত্রসমাজ জেগেছে’—এ ধরনের নানা স্লোগান দেন তারা। অবরোধকালে শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী নানা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও গান পরিবেশন করেন।

অবরোধের ফলে শাহবাগ থেকে ফার্মগেট, পল্টন, সায়েন্স ল্যাব, মগবাজার ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ হয়ে যায়। অবরোধ চলে টানা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল শুরু থেকেই।

সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন আদালতের বিরুদ্ধে নয়। আমরা চাই জনপ্রশাসন বিভাগ দ্রুত সমাধান দিক। ৫ জুলাই অনলাইনে প্রচার চালানো হবে। ৬ জুলাই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৭ জুলাই ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক ছাত্রধর্মঘট পালন করা হবে।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল করতে হবে এবং এটিকে আইনে পরিণত করতে হবে। শুধু প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণি নয়, সব গ্রেডে কোটা বাতিল করতে হবে। অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক ও ন্যূনতম কোটা রাখা যেতে পারে। কোটার পদ পূরণ না হলে মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। একই কোটা চাকরিতে একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না।

আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকার, শিক্ষক, এমনকি শিক্ষার্থীরাও কোটা চায় না। তাহলে কারা চায় এই কোটা? কে সেই অদৃশ্য শক্তি। নির্বাহী বিভাগ আমাদের আদালতের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে ঢাবির বিভিন্ন হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। আন্দোলনকারীদের রুখতে ছাত্রলীগ কখনো গেটে তালা ঝুলিয়ে, কখনো হল থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। ৪ জুলাই ঢাবির মাস্টার দা সূর্য সেন হলে সকাল ১০টার পর মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রলীগ। ফটকের বাইরে অবস্থান নেয় হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল্লাহ খান ওরফে শৈশবসহ কয়েকজন নেতাকর্মী। প্রায় আধঘণ্টা কোনো শিক্ষার্থী হল থেকে বের হতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তালা খোলা হয়।

সেদিন শুধু সূর্য সেন হল নয়, বিজয় একাত্তর হল, জহুরুল হক হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও জসীমউদ্‌দীন হলসহ বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ভয় দেখান। জসীমউদ্‌দীন হলের চারতলায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটকে রাখা হয়, যেন তারা আন্দোলনে যোগ দিতে না পারেন। সূর্যসেন হলের গেটে তালা দিয়ে পুরো একটি প্রজন্মের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা চলে। এছাড়া হলে কোটাবিরোধী প্রচার চালাতে গেলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হয়। অন্তত ২১টি হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সমর্থকদের টার্গেট করে।

৪ জুলাই রাতে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলমকে অমর একুশে হল থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের অনুসারীরা। সন্ধ্যায় তাকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আতঙ্কিত সারজিস হলত্যাগ করতে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গেট আটকে দাঁড়ান এবং তাকে আবার হলে ফিরিয়ে আনেন।

সেদিন সারজিস আলম গণমাধ্যমকে বলেন, কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা আমাকে হল ছাড়ার জন্য চাপ দেন। আমি ভয় পেয়ে বের হয়ে যেতে চাইলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বাধা দেন এবং আমাকে আবার হলে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সমবেত হন তারা।

এছাড়া সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেন্দ্র করে বিশেষত রাজশাহী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, সিলেট, রংপুরের শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের দাবিতে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, ধর্মঘট, অবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। প্রায় সর্বত্র পদযাত্রা বের করে সমাবেশ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেন।

এই বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

সর্বশেষ খবর

বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে এমন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আনতে চায় সরকার

সাইবার অপরাধ দমনে চীনের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ পুলিশ

সরকারি কলেজে শিক্ষা ক্যাডারের বদলি-পদায়ন স্থগিত

বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বিটিএমএ নেতাদের মতবিনিময়, সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার আশ্বাস

সরকারি কলেজে শিক্ষকদের বদলি-পদায়ন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত

দাওয়াত না পেয়ে মাতবরের অভিমান, টিসি নিল প্রাথমিকের ২৬ শিক্ষার্থী

পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক এমপি গ্রেপ্তার

হুতিদের হামলায় সৌদিতে প্রাণ গেল বাংলাদেশির

সর্বাধিক পঠিত

নাসিরউদ্দীনের গালি শুনে আমরা অভ্যস্ত : সিইসি

হারিয়ে যাওয়া ৫১টি মোবাইল প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিলো পুলিশ

সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ১৮ জুন

বাংলাদেশ–সুইজারল্যান্ড সম্পর্ক জোরদারে কাজ করার আশাবাদb

দেশে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ হবে আজ

নতুন পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির বৈঠক আজ, আলোচনায় যেসব ইস্যু

প্রশ্নফাঁসের ‘গুজবে’ কান না দেওয়ার অনুরোধ শিক্ষামন্ত্রীর

দুর্নীতির মামলায় তোফায়েল আহমেদের বিচার শুরু

এনসিপির জাতীয় কনভেনশন আজ,কোন সেশনে কি থাকছে

আজ চার দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী