বন্ধ্যাত্বকে এখনো অনেকাংশে নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষের কারণে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়। এবার নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরুষ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা ব্যয়ও নারীদের জটিল রোগ এন্ডোমেট্রিওসিসের মতোই বেশি।
ভারতের মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, পুরুষ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় দম্পতিদের ব্যয় প্রায় এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা ব্যয়ের সমান। এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত একটি আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
প্রতি ১০ দম্পতির মধ্যে ৬ জনই আর্থিক চাপে
গবেষণায় দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ দম্পতি ‘ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেন্ডিচার’-এর মুখে পড়েন, অর্থাৎ তাদের বার্ষিক আয়ের বড় অংশ চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে যায়। ফলে অনেক পরিবারই ঋণ বা সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বে প্রায় প্রতি ৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভোগেন।
পুরুষ বন্ধ্যাত্বের খরচ কতটা?
গবেষণায় ৫০০ দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে বিভিন্ন ধরনের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা ব্যয় তুলনা করা হয়।
গড় বার্ষিক ব্যয় ছিল—
এন্ডোমেট্রিওসিস: প্রায় ১৬,৯৪৩ রুপি
পুরুষ বন্ধ্যাত্ব: প্রায় ১৬,৫৬৬ রুপি
অন্যান্য বন্ধ্যাত্ব সমস্যা: প্রায় ১১,৩১৭ রুপি
অর্থাৎ পুরুষ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা ব্যয় এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রায় সমান, যা গবেষকদের মতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবহেলিত বিষয়।
কেন এত ব্যয়বহুল পুরুষ বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা?
পুরুষ বন্ধ্যাত্ব নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিভিন্ন জটিল পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
*হরমোন পরীক্ষা
*স্পার্ম বিশ্লেষণ
*জেনেটিক পরীক্ষা
*অস্ত্রোপচার
*আইইউআই ও আইসিএসআইয়ের মতো সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি
এসব চিকিৎসায় সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় ছাড়াও বারবার হাসপাতালে যাতায়াত, ওষুধ এবং সময়ের কারণে আয়ের ক্ষতিও যুক্ত হয়।
বেসরকারি হাসপাতালেই বেশি খরচ
গবেষণায় দেখা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি।
বেসরকারি হাসপাতাল: প্রায় ১৪,২১৭ রুপি
সরকারি হাসপাতাল: প্রায় ৮,৩৫৫ রুপি
তবে সরকারি হাসপাতালে বিশেষায়িত সেবা শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় অনেক রোগীকেই দূর থেকে আসতে হয়, যার ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচও বেড়ে যায়।
গড়ে রোগীদের প্রায় ৫৭ কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হয় চিকিৎসার জন্য, কিছু ক্ষেত্রে যা ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি।
বীমা সুবিধা প্রায় নেই
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মাত্র ১ শতাংশ দম্পতির কাছে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার জন্য কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবীমা রয়েছে। ফলে অধিকাংশ পরিবারকেই নিজেদের সঞ্চয় বা ঋণ নিয়ে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা
গবেষকরা বলছেন, বন্ধ্যাত্বকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে একে জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বীমা কাভারেজ বাড়ানো এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এ সেবা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা পুরুষ বন্ধ্যাত্ব নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য নীতিতে আরও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।







