আওয়ামী লীগপন্থী আমলাদের হাতে নির্বাচনের চাবি!

Post Image


সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দল সরকারে থেকেই নির্বাচন আয়োজন করায় সেটিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখার সক্ষমতা কতটা—তা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই দেখেছিলেন অনেকেই। তবে ওই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়।


তবে, প্রশাসনের সহায়তায় অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনটিকে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ইতিমধ্যেই বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত কমপক্ষে ১০ জন আমলা পদোন্নতি পেয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।


জানা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম জঘন্যতম নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করা হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনকে। এই নির্বাচনকে বলা হয় ‘রাতের ভোট’ এর নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও ভোরের আলো ফোটার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সে কাজে তাদের চূড়ান্ত সহায়তা করেন আমলা ও পুলিশ সদস্যরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমলারা দলীয় নেতা-কর্মীদের চেয়েও বেশি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে জানা গেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে।


এদিকে বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আশির্বাদপুষ্ট ১০ কর্মকর্তা বিভিন্ন জেলার ডিসি (জেলা প্রশাসক) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।


এরমধ্যে এমন ডিসিও রয়েছেন যিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করে একটি সাজানো নির্বাচন করায় সহায়তা করেছেন। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও একাধিক সংস্থা কর্তৃক তদন্তের প্রতিবেদন হাতে এসেছে।


প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি জেলার ডিসিরা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট। তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালী ছিলেন।


প্রতিবেদনের সূত্র মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিসিএস ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহান। তিনি নড়াইল জেলার ডিসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। তার স্বামী আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সহ-সভাপতি। এছাড়াও ওই কর্মকর্তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টেন্ডার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়। এসব বিষয়ে জানতে শারমিন আক্তারকে ফোন করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।


তালিকার থাকা বিসিএস ২৭ তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ এনামুল আহসান আছেন রংপুর জেলার ডিসির দায়িত্বে। তিনি এর আগে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থক। এনামুল আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালীন মন্ত্রীপরিষদ সচিব আনোয়ারুল ইসলামের স্ত্রী সাবেক তথ্য সচিব কামরুন নাহারের একান্ত সচিব বা পিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তথ্য সচিবের পিএস থাকাকালীন সাবেক তথ্য মন্ত্রী হাসান মাহমুদের পিএস আরিফ নাজমুলের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন।


সেই সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে আছে এবং এনামুল আহসান তাদের সঙ্গে এখনো গভীর সম্পর্ক রাখছেন।


তালিকায় থাকা ঝিনাইদহের ডিসি হিসেবে কর্মরত মো. আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বিসিএস ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। ডিসি হিসেবে পদায়নের আগে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। পরিবেশ উপদেষ্টার বিশেষ সুনজরের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ডিসি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন বলে জানা গেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকাকালীন তিনি ছাত্রলীগের পদধারী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি এর আগে বরিশালের হিজলা উপজেলার ইউএনও এবং কিশোরগঞ্জ জেলার এডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।


এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল মাসউদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ অস্বীকার করেন।


কিশোরগঞ্জের ডিসি হিসেবে পদায়ন হওয়ার আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মাদ আসলাম মোল্লা। বিসিএস ২৭ ব্যাচের এ কর্মকর্তাকে তার ব্যাচের সবাই আওয়ামী পন্থী হিসেবেই চেনেন। পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ভারতে পলাতক মনিরুল ইসলামের স্ত্রী শায়লা ফারজানার খুবই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। শায়লা ফারজানা সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পুলিশের উচ্চপদস্থ এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তার স্ত্রী হওয়ায় বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে শায়লার বিরুদ্ধে। এদিকে শায়লার সাথে ভালো সম্পর্ক হওয়ায় আসলাম মোল্লাও বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। শায়লা ফারজানার সঙ্গে সিন্ডিকেট করে অনেক দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ পেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে আসলাম মোল্লা বলেন, ‘এ তথ্য সম্পূর্ণ ভুয়া এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে শায়লা ফারজানাকে চিনিই না। তার সাথে কখনো আমার দেখা হয়নি। আমি ঢাকায় জয়েন করেছি ৫ আগস্টের পরে। এর আগে কখনোই চাকরিসূত্রে ঢাকার কোথাও পোস্টেড ছিলাম না। এই তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা।’


গাজীপুরের ডিসি হিসেবে কর্মরত ২৭ বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলম হোসেন। তিনি ডিসির দায়িত্বের আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের প্রোটকল অফিসার হিসেবে ৪ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার পরিবারও স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়।


মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী পরিকল্পনা বিভাগের উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং তার পরিবার স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত। প্রশাসনিক ভাবে আওয়ামী লীগকে স্বৈরশাসক হিসেবে গড়ে ওঠার পিছনে বিশেষ অবদান থাকা প্রয়াত এইচ টি ইমামের সঙ্গে নুরমহল আশরাফীর বিশেষ সখ্যতার কথা জানা গেছে।


কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। তিনি ২৮ তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। এই দায়িত্বের পূর্বে তিনি উপ ভূমি সংস্কার কমিশনার হিসেবে ভুমি সংস্কার বোর্ডে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিজে আওয়ামী সমর্থক এবং তার স্বামী আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতা।


লক্ষীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান ২৭ তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার আওয়ামী লীগের সমর্থক। ছাত্রজীবনে সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনিও নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন।


পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মো. শহীদ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী নেতাদের বিশেষ সখ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি ও ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জহিরুদ্দিন মাহমুদ লিপ্টনের একান্ত সহচর ছিলেন শহীদ হোসেন চৌধুরী। এছাড়া তার ভাই নিজেও আওয়ামী লীগ নেতা বলে জানা গেছে।


কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান নিজে আওয়ামী লীগ সমর্থক। ২৭ বিসিএস ব্যাচের এ কর্মকর্তা ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া তার পিতা দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


স্বৈরাচার সরকারের সুবিধাভোগী এবং আওয়ামী লীগপন্থী দশজন ডিসি কীভাবে দায়িত্বে আছেন জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, 'এসব কর্মকর্তারা আগেই নিয়োগ পেয়েছেন। ইসি তখনো দায়িত্ব নেয়নি। সরকার এদের নিয়োগ দেওয়ার আগে নিশ্চয়ই তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই নিয়োগ করেছিলেন। এরমধ্যেও যদি কেউ কেউ লীগপন্থী হয়ে থাকেন এবং তাদের ব্যাপারে নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন তবে অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। সরকারের মধ্যেও তো বিতর্কমুক্ত কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। আমাদের চাহিদামতো কর্মকর্তাও দিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরমধ্যেও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আমরা দেখবো।


তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য কিংবা অভিযোগ আসেনি কারো বিরুদ্ধে। আপনাদের নিউজ দিয়েই তো আমরা তথ্য পাই বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

সর্বশেষ খবর

জামায়াত আমিরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে ইসিতে ১১ নারী সংগঠন

আওয়ামী লীগপন্থী আমলাদের হাতে নির্বাচনের চাবি!

চীন থেকে ৪ নতুন জাহাজ কিনছে বাংলাদেশ

ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগে ইসির দুর্বলতা দৃশ্যমান: টিআইবি

চীন থেকে ৪ নতুন জাহাজ কিনছে বাংলাদেশ

নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

হাদি হত্যার সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা চেয়েছে সরকার

জামায়াত আমিরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি নিয়ে ইসিতে নারী সংগঠনের নেতারা

সর্বাধিক পঠিত

গুম থেকে জীবিত ফেরা ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের

শেখ হাসিনা, তারেক সিদ্দিকীসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ৩ ও ৭ ডিসেম্বর

গণভোটের প্রস্তুতি নিতে ইসিকে সরকারের চিঠি

বিটিভিতে দলীয় প্রধানদের নির্বাচনী প্রচারণার স্লট বরাদ্দের নির্দেশ

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলন ২৬ ডিসেম্বর

জকসুতে বিজয়ীদের জামায়াত আমিরের অভিনন্দন

হাদির ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন, দোয়া চাইলেন তাসনিম জুমা

জয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি

হাদির মাথায় জটিল অপারেশনের শেষ চেষ্টা চলছে

১৪ হাজার সাংবাদিকের ‘তথ্য ফাঁস’, ব্যাখ্যা দিল ইসি