ঋণ খেলাপিদের নাম ও ছবি প্রকাশ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুমতি চেয়েছেন বেসরকারি খাতের ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতারা। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনুপযোগী ঘোষণাসহ ব্যাংকের নিলামে বিক্রয়-ক্রয় করা সম্পত্তি হস্তান্তরে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার চান তারা।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ব্যাংকগুলোর পক্ষে এবিবি এক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে। গত ১২ নভেম্বর খেলাপি ঋণ আদায়ে এবিবির সঙ্গে সভা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই সভায় ব্যাংকারদের কাছ থেকে সুপারিশ চাওয়া হয়। আড়াই মাস পর খেলাপির তালিকা প্রকাশসহ একগুচ্ছ সুপারিশ জমা দিয়েছে এবিবি। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— খেলাপি ঋণ কমানো, খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ঋণের অর্থ পরিশোধ, বন্ধকি সম্পদ বিক্রয় করে ঋণ আদায়, মামলা পরিচালনা সহজসহ রায় দ্রুত কার্যকর এবং নতুন খেলাপি ঋণ না বাড়ানো।
এদিক খেলাপিদের তালিকা শাখা পর্যায়ে প্রকাশ করতে সর্বপ্রথম ২০১৪ সালে একটি উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় তা আটকে দেয় ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সবশেষ ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পুনরায় একই উদ্যোগ নেওয়া হলে তাও রাজনৈতিক প্রভাবে আটকে যায়। খেলাপি ঋণ আদায়ে গত ২০২১ সালেও পুনরায় অর্থমন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বৈঠকে তালিকা প্রকাশের বিষয়টি আলোচিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে এবার সেই একই সুপারিশ পুনরায় উঠলো। এবিবি যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো হলো :
১. খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিক হ্রাসকরণ বিষয়ক প্রস্তাবনা: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে খেলাপি ঋণসমূহ আংশিক অবলোপনের সুবিধা প্রদান। লিয়েনকৃত শেয়ার নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ। মৃত্যু, মরণব্যাধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহ ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, কিংবা তার একক-মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠান এর সুদ মওকুফের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে হেড অফ আইসিসির মতামত গ্রহণের শর্ত লাঘব।
২. খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের ঋণের অর্থ পরিশোধে উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ক প্রস্তাবনা: খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক অথবা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান। ব্যাংকগুলো কর্তৃক খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমোদন প্রদান। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যেকোনো ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুপযোগী ঘোষণা প্রদান।
৩. বন্ধকি সম্পদ বিক্রয়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় তরান্বিতকরণ বিষয়ক প্রস্তাবনা: ব্যাংকের নিলামে বিক্রয়/ক্রয়কৃত সম্পত্তি হস্তান্তরে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার। নিলামে সম্পদ ক্রয়কে উৎসাহিতকরণে নিলাম ক্রেতাদেরকে আয়কর রেয়াত কিংবা অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান। প্রতিষ্ঠান কর্তৃক স্থানভেদে নিলামে বিক্রিত সম্পদ ক্রয়ে জেলাপ্রশাসকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বিলোপকরণ। নিলামে বিক্রিত সম্পদের হস্তান্তর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস-এর সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ। নিলামে বিক্রয়ের সুবিধার্থে, বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেও ব্যাংক কর্তৃক জমির খাজনা ও জরিপ সম্পন্ন করার সব সুবিধা নিশ্চিতকরণ। আদালত কর্তৃক ব্যাংকের নামে মালিকানা হস্তান্তরিত জমির (অর্থ ঋণ আদালত আইনের ৩৩ (৭) ধারা মোতাবেক) নামজারি, বয়নামা এর ভিত্তিতে বিনা খরচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্নকরণ।
৪. মামলা পরিচালনা সহজ ও রায় দ্রুত কার্যকরকরণ বিষয়ক প্রস্তাবনা: খেলাপি ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ঋণের জামানতদাতাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত আমানত, সঞ্চয়পত্র এর তথ্য, মালিকানাধীন সম্পদের তথ্য, আয়কর রিটানের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম সনদ, মৃত্যু সনদ, পাসপোর্টের তথ্য, আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতীত চাহিবামাত্র প্রাপ্তির সুবিধা নিশ্চিতকরণ। ব্যাংকের বা আদালতের যেকোনো পদক্ষেপের বিপরীতে আদালতের গমনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট জমা প্রদানের শর্তারোপ। সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে স্টে-অর্ডার প্রাপ্তির সুবিধা আইনিভাবে রহিতকরণ। উচ্চ আদালত হতে প্রদত্ত স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ প্রদানের শর্ত নিশ্চিতকরণ ও উক্ত নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে আদালতের হস্তক্ষেপ ব্যতীত উক্ত স্টে-অর্ডার বাতিল হিসাবে পরিগণনাকরণ। উচ্চ আদালত কর্তৃক স্টে-অর্ডার প্রদানের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিতকরণ। যেসব জেলায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি, সে সব জেলায় অবিলম্বে পৃথক অর্থ ঋণ আদালত স্থাপন। থানাগুলোর খেলাপি ঋণসংক্রান্ত আটকাদেশ সমূহ জরুরি ভিত্তিতে তামিল নিশ্চিতকরণ। আদালত হতে থানায় সাত দিনের মধ্যে আটকাদেশ প্রেরণ নিশ্চিতকরণ। অর্থ ঋণ মামলায় ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিতকরণ। অর্থ ঋণ মামলায় দেওয়ানি আটকাদেশ এর পরিমাণ ছয় মাসের স্থলে ঋণের পরিমাণ ভেদে সাত বছরে উন্নীতকরণ। স্বল্পতম সময়ে অর্থঋণ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনের প্রণয়ন।
৫. নতুন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি নিরসনে প্রস্তাবনা: জরুরি ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও মূল্যায়নকারী এর তালিকা প্রকাশ। নিবন্ধক কিংবা তহশিল অফিসে বন্ধকি সম্পদ-এর তালিকা সহজে যাচাইকরণের সুবিধা নিশ্চিতকরণ। সিআইবি ডাটাবেজের ন্যায় বন্ধকি সম্পদের ডাটাবেজ প্রণয়ন ও সহজে তা যাচাইকরণের সুবিধা প্রদান।







