কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়ম রোধে উদ্যোগ নিয়েছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। এর অংশ হিসেবে উপজেলার ৩২টি সার ডিলারের কার্যক্রম অনলাইনে নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় ডিলারদের সার বরাদ্দ, উত্তোলন, দৈনিক বিক্রি ও অবশিষ্ট মজুতের তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে উপজেলার ৯০টি ওয়ার্ডে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে সার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি, সার কার্ডের মাধ্যমে প্রায় শতভাগ সার বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এবার সার বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে অনলাইন নজরদারি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সহযোগিতায় একটি অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি সার ডিলারকে বরাদ্দ, সার উত্তোলন, দৈনিক বিক্রি ও অবশিষ্ট মজুতের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। এসব তথ্য কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারি ওয়েব পোর্টাল dae.dimla.nilphamari.gov.bd-এ দেখতে পারবেন। পাশাপাশি সার কার্ডের মাধ্যমে সার বিক্রির তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রতিদিনের বিক্রির হিসাব অনলাইনে জমা দিতে হবে ডিলারদের।
এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বরাদ্দের বিপরীতে কতটুকু সার উত্তোলন ও বিক্রি হয়েছে এবং কতটুকু মজুত রয়েছে, তা সহজেই যাচাই করা যাবে। ফলে বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিক্রির হিসাবে অসংগতি শনাক্ত করা, মজুতের তথ্য যাচাই এবং অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা সহজ হবে। একই সঙ্গে সরকারি ভর্তুকির সার প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সার বিতরণে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি সারের সুষম ব্যবহার, উৎপাদন খরচ কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। আগামী রবি মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে জমির উর্বরতা ও পুষ্টি উপাদানের অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাটি পরীক্ষায় প্রতি গ্রাম মাটিতে ফসফরাসের পরিমাণ প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে, যা অতি উচ্চ মাত্রা হিসেবে বিবেচিত। মাটিতে পর্যাপ্ত ফসফরাস থাকায় ভুট্টা চাষে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডিএপি সার ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, ডিএপি সারে ফসফরাস থাকায় মাটির পুষ্টি উপাদান বিবেচনা না করে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। অথচ এতে ফলন বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। এতে কৃষকের অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির সারের যথাযথ ব্যবহারও ব্যাহত হতে পারে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, ভুট্টা চাষে বিঘাপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ কেজি ডিএপি সার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে জমির মাটির অবস্থা, ফসলের পুষ্টি চাহিদা ও অন্যান্য সার প্রয়োগের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে সারের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও জমির উৎপাদনক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতি তিন বছর পরপর প্রতি শতক জমিতে ৩ থেকে ৪ কেজি হারে ডলচুন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভুট্টার ভালো ফলন নিশ্চিত করতে উন্নতমানের বীজ, সঠিক মাত্রায় সার এবং মানসম্মত মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্য ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের মতে, মাটির পুষ্টি উপাদান বিবেচনা করে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির সারের অপচয় রোধ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার না করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করা জরুরি।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, সার কার্ড ও অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে সারের হিসাব সংরক্ষণ করা হলে প্রতি কেজি সারের হিসাব পাওয়া যাবে। এতে সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিক্রির তথ্য যাচাই করাও সহজ হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, ইতোমধ্যে উপজেলার ৯০টি ওয়ার্ডে কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণ করে সার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এখন সার ডিলারদের প্রতিদিনের সারসংক্রান্ত তথ্য অনলাইন অ্যাপে হালনাগাদ করতে হবে। সরকারি ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে এসব তথ্য দেখা যাবে। এর ফলে সার বিতরণ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সার কার্ড ও অনলাইন নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সার বিতরণে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচ কমানো, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সরকারি ভর্তুকির সঠিক ব্যবহারেও উদ্যোগটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ব্যবস্থার সুফল পেতে ডিলারদের নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।







