৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশ পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ফাহিম ফয়সাল। মেধা তালিকায় ৪০তম স্থান অর্জন করা এই তরুণের চার বছরের পরিশ্রম ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলেছিল।
তবে চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশের পর সেই স্বপ্ন থমকে গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গেজেটে নাম না আসায় চরম হতাশা ও ক্ষোভে ভেঙে পড়েছেন ফাহিম ও তার পরিবার।
বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফাহিম ফয়সাল বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে ২০২২ সালে স্নাতক (অনার্স) ও ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে তিনি বগুড়া শহরের চাঁদনী বাজার এলাকায় জনতা ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফাহিমের বাবা মো. খাইরুল বাশার একজন আইনজীবী এবং মা শাহানাজ বেগম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ফাহিমের ছোট ভাই নাফিস ফয়সাল সরকারি আজিজুল হক কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী।
ফাহিম ফয়সাল ২০২২ সালে প্রথম বিসিএস হিসেবে ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি পান।
তার প্রথম পছন্দ ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডার, দ্বিতীয় প্রশাসন এবং তৃতীয় পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার। ২০২৩ সালে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভাইভা প্রদান করেন। একই বছরের নভেম্বর মাসে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হলে তিনি পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
পরবর্তীতে তিনি ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিলেও ৪৫তম বিসিএসে এএসপি পদে সুপারিশ পাওয়ার পর আর কোনো ভাইভায় অংশ নেননি কিংবা নতুন কোনো চাকরির আবেদনেও যাননি। দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষার পর ১৪ অক্টোবর (বুধবার) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করে।
কিন্তু সেই গেজেটে তার নাম অনুপস্থিত। সম্প্রতি প্রকাশিত এই গেজেটে বিভিন্ন ক্যাডারের মোট ১০৪ জন এবং সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে অন্তত ৫৬ জন গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন।
নিজের অনুভূতি ও আক্ষেপ প্রকাশ করে ফাহিম ফয়সাল বলেন, আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, আমি কখনো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকে পড়ালেখা করেছি। কোনো সুপারিশ বা তদবির ছাড়া কেবল নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এই স্থান অর্জন করেছিলাম। আমার অপরাধটা কোথায়, তা স্পষ্ট করে জানানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, যদি কোনো অন্যায়ের প্রমাণ থাকে, আমি দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া এভাবে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মেনে নেওয়া কঠিন। সরকার যদি তদন্ত সাপেক্ষে কোনো অপরাধ না পায়, তবে আমার প্রাপ্য সুযোগটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে বগুড়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন বলেন, গত ১৭ বছর বগুড়া জেলা বঞ্চিত ছিল। সে ধারা যদি এখনও অব্যাহত থাতে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কেন তার নাম গেজেটে এলোনা, এর সুষ্ঠ তদন্ত হওয়া উচিত।
এ ছাড়া নিজের বঞ্চিত হওয়ার কথা জানিয়ে ফাহিম তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা লিখেছেন পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
‘আলহামদুলিল্লাহ
সহকারী পুলিশ সুপার (সুপারিশপ্রাপ্ত)
Not- Gazetted
ঠিক কোন অপরাধে আমাকে গেজেট বঞ্চিত করা হলো, জানি না। রাষ্ট্রের সেটা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে, যেন তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। আর যদি কোনো অপরাধ না থাকে, আমাকে আমার প্রাপ্য সুযোগ দেওয়া হোক।
অনার্স রেজাল্ট হবার আগেই ২০২২ সালে ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার পাই। প্রথম বিসিএস, আবেগও ছিল তুঙ্গে। কিভাবে দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেছি, কাছের লোকেরা দেখেছে।
প্রথম বিসিএসে পছন্দের ক্যাডার পেয়ে যাওয়ায় আর কোনো বিসিএসে অগ্রসর হইনি। আমারও পাইপলাইনে ৪৬, ৪৭ ছিল। ভাইভা/রিটেন দিলে যে প্রিপ্রারেশন ছিল হয়ত আরো চাকরি পেতাম। বেকারদের কথা মাথায় রেখে কাউকে বঞ্চিত করতে চাইনি।
সেই আমিই আজ বঞ্চিত।
২০২২ থেকে ২০২৬, চারটি বছর পর এই বিসিএসের সব ধাপ পার করে আজ আমি খালি হাতে ফিরছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স করে বিদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে আমি মনে করতাম। যদিও কাছের অনেকেই আমাকে বারবার সতর্ক করেছিল— এ দেশে মেধার মূল্য নাই।
ভালো থাক বাংলাদেশ।
#বঞ্চিত ৫৬ জনের গেজেট চাই’
এদিকে বিসিএসে মেধা তালিকায় থেকেও গেজেট থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় ফাহিমের বাবা-মা ও নিকটজনেরা হতভম্ব ও চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি বঞ্চিত ৫৬ জন বাদ পড়া প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।







