কেন রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি ও রহমতের নবী?

Post Image

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বজগতের জন্য পরম রহমত এবং মানবজাতির মুক্তির দিশারি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ মানবজাতির জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আল্লাহতাআলা তাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য দয়া ও কল্যাণস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তার পুরো জীবন ছিল মানবসেবা, ক্ষমা, উদারতা এবং ত্যাগের এক অনন্য মূর্ত প্রতীক। নিচে তার অনুপম ও সুমহান চরিত্রের বিভিন্ন দিক কুরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হলো।

১. বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও হেদায়াতের রূপকার

আল্লাহতাআলা তার প্রিয় রাসুল (সা.)-কে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। মানুষকে ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে সরল পথে পরিচালিত করতে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে তিনি আমৃত্যু সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

‘আর আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ১০৭)

হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

 مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا فَجَعَلَ الْجَرَادُ وَالْفَرَاشُ يَقَعُونَ فِيهَا وَهُوَ يَذُبُّهُنَّ عَنْهَا وَأَنَا آخِذٌ بِحُجُزِكُمْ عَنْ النَّارِ وَأَنْتُمْ تَفَلَّتُونَ مِنْ يَدِي

‘আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করল। যখন তার চারপাশ আলোকিত হলো, তখন পতঙ্গ ও নানা রকম পোকা-মোকড় আগুনে পড়তে লাগল আর সে ব্যক্তি সেগুলোকে তা থেকে বাধা দিতে লাগল। ঠিক তেমনি আমি আগুন থেকে রক্ষার জন্য তোমাদের কোমরবন্ধগুলো ধরে রাখি এবং বলি, 'আগুন থেকে দূরে থাক, আগুন থেকে দূরে থাক।' আর তোমরা আমাকে হারিয়ে দিয়ে তার মাঝেই ঢুকে পড়ছ।’ (মুসলিম ৫৭৫৮)

মানুষের হেদায়াতের প্রতি তার এই অগাধ ব্যাকুলতা ও গভীর দরদের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا

‘তারা এই বাণীতে ইমান না আনলে সম্ভবত আপনি তাদের পেছনে দুঃখে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবেন।’ (সুরা আশ-শুআরা: আয়াত ৩)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুপম স্নেহ ও প্রীতির কথা এভাবে ঘোষণা করেছেন—

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ

‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এমন একজন রাসুল এসেছেন, যার জন্য তোমাদের যে কোনো কষ্ট অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণে অতি আগ্রহী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১২৮)

২. জাগতিক জীবনে দয়া, পরোপকার ও মহানুভবতা

আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব জগতেও রাসুল (সা.) মানুষের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তিনি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন, দরিদ্র, প্রতিবেশী ও এতিমদের প্রতি সদয় আচরণ করতেন।

কারো কোনো আবদারে তিনি কখনো ‘না’ বলতেন না। আল্লাহর পথে শত্রুর মোকাবিলার প্রয়োজন ছাড়া তিনি কখনো নিজের হাত দিয়ে কাউকে আঘাত করেননি। ঘরে যা উপস্থিত থাকত, তা-ই খেতেন এবং অভাবী ও পরিবারের প্রয়োজনে নিজেকে কষ্ট দিয়েও অন্যদের অগ্রাধিকার দিতেন।

যা পেতেন তা ফিরিয়ে দিতেন না, আর যা নেই তার জন্য কোনো আফসোস বা কষ্ট করতেন না। নিঃস্বদের বোঝা বহন করতেন, অভাবীদের উপার্জন করে দিতেন এবং বিপদগ্রস্তদের সর্বাত্মক সাহায্য করতেন।

৩. ক্ষমার এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

রাসুল (সা.) ব্যক্তিগত জীবনে কখনো কারো ওপর প্রতিশোধ নেননি। এমনকি মক্কার যে মানুষগুলো তাকে অকথ্য নির্যাতন করে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল, তাদের প্রতিও তিনি প্রদর্শন করেছিলেন পরম ক্ষমা। হিজরতের সময় স্বদেশ সম্পর্কে তিনি গভীর ভালোবাসার সুরে বলেছিলেন—

‘যদি আমার জাতি আমাকে বের করে না দিত, তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’

এর প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখা যায় মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে। সেদিন মক্কাবাসীদের অপরাধ ক্ষমা করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন ঐতিহাসিক ঘোষণা— ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনি পরম দয়ালু।’

৪. দয়া ও দাক্ষিণ্যের ইসলামী বিধান

ইসলাম মানব সমাজে পারস্পরিক দয়া ও ভালোবাসার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। রাসুল (সা.) তার বাণীতে উম্মতকে সর্বদা দয়ালু হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন—

مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ

‘যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।’ (বুখারি ৫৯৯৭)

অন্য হাদিসে এসেছে—

ارْحَمُوا مَنْ فِي الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ

‘তোমরা জমিনবাসীদের প্রতি দয়া করো, তবে আসমানবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (মুসলিম ২৩১৮)

পরিশেষে বলা যায়, নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ হলো মানবজাতির জন্য অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার একমাত্র নিরাপদ পথ। আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র কুরআনের বরকত দান করুন এবং এর সুমহান আয়াত ও নির্দেশনাবলীর মাধ্যমে আমাদের জীবনকে উপকৃত করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এবং সকল মুসলিম উম্মাহকে ক্ষমা করুন ও তার প্রিয় রাসুলের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।


সর্বশেষ খবর

কেন রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি ও রহমতের নবী?

বিদেশ যাওয়ার জন্য ‘চুক্তিতে বিয়ে’, ইসলামে কি জায়েজ?

জুমার দিনে যে আমল করতে হয়

ফরজ গোসল না করে রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ করা কি জায়েজ

আলিয়া ও কওমি আমার দুই চোখের মতো প্রিয়, বলেছিলেন আল্লামা সাঈদী

বিয়ে গোপনে নয়, প্রকাশ্যে

রাতে ঘুমাতে গেলেই নাক বন্ধ, এটা কি রোগের ইঙ্গিত?

হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু ২৭ জুলাই