পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা ঘিরে একাধিক নতুন নিয়ম ও নির্দেশনা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এর মধ্যে পূজা ও বিসর্জনের সময় ডিজে বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মহাষ্টমীর দিন সব মদের দোকান ও পানশালায় মদ বিক্রি বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া বড় বাজেটের পূজা কমিটিগুলোকে সরকারি অনুদান না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) নিউ টাউনের মিলনমেলা প্রাঙ্গণে দুর্গাপূজা কমিটিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে এসব ঘোষণা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, যেসব ছোট বা আর্থিকভাবে দুর্বল পূজা কমিটি সরকারি সহায়তা ছাড়া পূজা আয়োজন করতে পারবে না, তাদের ১ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। তবে বড় বাজেটের পূজা কমিটিগুলোকে সরকারি অর্থ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি অনুদানের বিষয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আগে এক কর্মসূচিতে বলেছিলাম, যাদের (কমিটি) ছোট বাজেট, তাদের অনুদান দেব। আমি মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চাই না। যারা সক্ষম (বড় বাজেটের পুজো কমিটি), তাদের বলব, সরকারের অর্থনৈতিক সাহায্য না-নিতে। যাঁরা এই টাকা না হলে পুজো করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য সরকার এক লক্ষ টাকা দেবে।’
এরপর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ের অনুদান ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী যা করছিলেন, ঠিক নয়। গত বার কত দিয়েছিলাম, এ বার তা হলে এক লাখ। সকালে মাছের বাজারে এ সব করি (আমরা)। ঠিক নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজ্যে ২৫ হাজার দিয়ে শুরু হয়েছিল অনুদান (দুর্গাপুজোর) দেওয়া। ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ভোটে লাভ হয়নি। অনেকেই নির্ভরশীল হয়ে গিয়েছে।’
তবে পূজা কমিটিগুলোর জন্য বিদ্যুৎ খরচে বড় ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতাসহ গোটা রাজ্যের পূজা কমিটিগুলোকে বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া দমকলের ছাড়পত্র নেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো টাকা দিতে হবে না কমিটিগুলোকে। এ বিষয়ে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ও সিইএসসির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পূজার নিয়মকানুনের বিষয়ে শুভেন্দু অধিকারী আরও কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পূজার সময় কোনো জাতীয় সড়ক আটকে রাখা যাবে না। কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ করেও পূজার আয়োজন করা যাবে না। পাশাপাশি পিতৃপক্ষ বা দেবীপক্ষ শুরুর আগে পূজার উদ্বোধন করা যাবে না। প্রতিমা, মণ্ডপ বা থিমে এমন কিছু করা যাবে না, যাতে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আঘাত লাগে।
সবচেয়ে কড়া নির্দেশনা এসেছে ডিজে বাজানো নিয়ে। পূজার দিনগুলোর পাশাপাশি বিসর্জনের সময়ও ডিজে বাজানো যাবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মহরমের শোভাযাত্রা ছিল, বলেছি ডিজে বাজাবেন না। অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে দিইনি। সকলের সহযোগিতা নিয়েই করেছি সেটা। এ বার পুজোয় ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি। সহযোগিতা করবেন।’
মহাষ্টমীর দিন রাজ্যে ‘ড্রাই ডে’ পালনের ঘোষণাও দিয়েছেন শুভেন্দু। ওই দিন সব মদের দোকান বন্ধ থাকবে। পানশালা খোলা থাকলেও সেখানে মদ পরিবেশন করা যাবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
এবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দুর্গাপূজা উদ্যাপনেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগের সরকারের সময় রেড রোডে যে ধরনের পূজা কার্নিভালের আয়োজন করা হতো, এবার তা হবে না। এর পরিবর্তে মহালয়ার দিন কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বড় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ওই অনুষ্ঠানে ড্রোন ও আতশবাজির প্রদর্শনী থাকবে এবং পুরো আয়োজন প্রায় চার ঘণ্টা চলবে। এ ছাড়া রোডশোরও আয়োজন করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উপস্থিত থাকবেন বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মহালয়ার অনুষ্ঠান নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠানটির প্রচারের জন্য প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে ১১টি হাতবিশিষ্ট দুর্গাপ্রতিমার ছবি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে। দলটির অভিযোগ, বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গা এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘তুচ্ছ’ করা হয়েছে।
সোমবার পূজা কমিটিগুলোর সঙ্গে বৈঠকের শুরুতেই ওই বিজ্ঞাপন নিয়ে ক্ষমা চান শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি জানান, নতুন সরকারের অধীনে দুর্গাপূজাকে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজন করা হবে।
এবারের দুর্গাপূজায় সরকারি পুরস্কারের ব্যবস্থাও থাকছে। শ্রেষ্ঠ প্রতিমা, শ্রেষ্ঠ মণ্ডপ, পরিবেশবান্ধব পূজা, জনসমাগম ও ভিড় ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পূজা কমিটি ও সংশ্লিষ্টদের পুরস্কার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিচারকেরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন বলেও তিনি জানান।
ফলে এবার পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজায় অনুদান, বিদ্যুৎ বিল, ডিজে, মদ বিক্রি, সড়ক ব্যবহার ও সরকারি কার্নিভাল—সব ক্ষেত্রেই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ডিজে নিষিদ্ধ এবং মহাষ্টমীতে মদ বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্তই পূজার আয়োজন ও উদ্যাপনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।







