জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যুতে সরকারি দলকে চাপের মুখে রাখার কৌশল নিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য। উদ্দেশ্য হলো, সংসদে ও রাজপথে আন্দোলন করে সংস্কার প্রশ্নে সরকারি দলকে বাধ্য করা।
জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন প্রশ্নে জাতীয় সংসদে সব বিষয়ে একমত হতে পারেনি সরকারি ও বিরোধী দল। সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর করেছে-এমন অভিযোগ তুলে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। প্রাথমিক কর্মসূচি হিসাবে প্রথমে ৪ এপ্রিল বিকালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে তারা। পরে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে এক সপ্তাহের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, বিভাগীয় ও জেলা সদরে সমাবেশের সেই কর্মসূচি এখনো চলমান রয়েছে। আজ বেলা ১১টায় ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টি আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাদ দিয়ে ১৬টি পর্যালোচনার জন্য রেখেছে সরকার।
এখন বিরোধী দল এই ১৬টিসহ জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাইছে।
তবে বিরোধী দলগুলো মনে করছে, একদিকে যেমন আন্দোলনে যাওয়ার বিকল্প নেই, অন্যদিকে মাত্র ২ মাস বয়সি নির্বাচিত একটি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায় সেটিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে তাদের। তাই রাজপথের কর্মসূচি শুরু হলেও এই মুহূর্তেই তারা বড় ধরনের কোনো শোডাউনে যাবে না। তবে দলগুলো আন্দোলনের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়; অন্যদিকে, ‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন’র যে ঘোষণা সরকারি দল দিয়েছে তার জন্য আরও কিছুটা সময় দিতে চাইছে তারা। এক মাস সময়সীমার মধ্যে জনগুরুত্বপূর্ণ যেসব অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়েছে তার সবই সংশোধিত আকারে সংসদে বিল আনার আশ্বাস দিয়েছে সরকারি দল। তবে এ সত্ত্বেও সরকারকে তারা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে রাজি নন। তাই এসব ইস্যুতে সংসদীয় কমিটি এবং সংসদ অধিবেশনে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও চালিয়ে যাবেন তারা।
তবে এই মুহূর্তে বড় ধরনের আন্দোলনে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুবিধা হবে এমন আলোচনাও আছে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটি আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হোক এটি আবার তারা চাইছে না। তাই ভিন্ন কৌশলে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে তারা সোচ্চার থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উভয় স্থানে জনগণের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়ের পক্ষে জনমত গঠনে জুলাই যোদ্ধা ও ছাত্র-জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো; সরকারকে চাপে রেখে দাবি বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ১৩ এপ্রিল ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বলেছেন, আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে এবং এই আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। জনগণের রায় বাস্তবায়নে আমরা সামনের সারিতে থাকব উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, যতদিন জাতির অধিকারের পক্ষে লড়াই করা সম্ভব, ততদিনই সংসদে থাকব; তার বাইরে এক সেকেন্ডও নয়।
দলটির নেতাদের মতে, রাজপথের পাশাপাশি সংসদের ভেতরের আন্দোলন আরও জোরদার করার বার্তাই দিয়েছেন জামায়াত আমির। পাশাপাশি একটা পর্যায়ে গিয়ে সংসদ বয়কটও করতে পারেন এমনটিও মনে করেন কেউ কেউ। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদ বয়কটের মতো চিন্তাভাবনা আপাতত দলটির নেই।
আন্দোলন কতদূর টেনে নেওয়া হবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই মুহূর্তে বড় কোনো শোডাউনে আমরা যাচ্ছি না। আমরা জনগণকে সচেতন করছি। আশা করি সরকারও সচেতন হবে। তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং গণরায় বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে। আমরা ইতিবাচকভাবে আগাব। তাতে কাজ না হলে একপর্যায়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি আসবে। আশা করি ক্ষমতাসীনরা সেপথে আমাদের ঠেলে দেবেন না।
১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। গণভোটের রায় যতক্ষণ না বাস্তবায়ন হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আমরা সফলতা নিয়েই ঘরে ফিরতে চাই।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের নামে তারা জনগণকে ধোঁকা দিতে চায়। আমরা জনগণকে সচেতন করব যে সংস্কার এবং সংশোধনের মধ্যে পার্থক্য কি? সংবিধান সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকারি দল সংবিধান সংশোধনের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ঠিক রেখে তাদের মনমতো কিছু সংশোধন করতে চায়। আমরা সেটা হতে দেব না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের গণসংযোগ কর্মসূচি আছে। এই কর্মসূচি শেষ হলে আমরা নতুন কর্মসূচি দেব। শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে যেমন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান থাকবে তেমনি লড়াই চলবে রাজপথেও।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বুধবার বলেন, আমাদের আন্দোলন জনগণের রায়ের আন্দোলন। জনগণ যে রায় দিয়েছে তার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। সেমিনার, লিফলেট বিতরণসহ ব্যাপক গণসংযোগের কর্মসূচি এখন চলমান আছে। সামনে আরও কর্মসূচি আসবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, সংসদে সংকট সমাধানের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। সেজন্যই রাজপথের কর্মসূচি আসছে। এই সংকট সৃষ্টি করেছে বিএনপি। সমাধানও তাদের হাতে। তারা এগিয়ে না এসে অহমিকায় মেতে উঠলে আমাদের রাজপথেই সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বুধবার বলেন, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। জনগণের সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে বিএনপি অস্বীকার করছে। এখন জনগণের রায় বাস্তবায়নে রাজপথের বিকল্প নেই। তবে আমরা আশা করেছিলাম যে সংসদেই বিষয়টির সুরাহা হবে। কিন্তু সরকার বাঁকা পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, জনগণ তাদের ম্যান্ডেটের বাস্তবায়ন চায়। আমরা জনগণের সঙ্গে আছি। তাদের দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এই আন্দোলন শেষ হবে।







