জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) সাংবাদিক সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা ও দখলচেষ্টার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঠিকাদারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার ওমর ফারুক রুমি হামলার নেপথ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রুমি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা এজাহারের ১২২ নম্বর আসামি। সাংবাদিক সমিতিতে হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার নাম সামনে এলেও নেপথ্যে রুমির ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সমিতির কয়েকজন সদস্য।
সাংবাদিক সমিতির সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন উপলক্ষে গত বছরের ২৬ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সদস্য আহ্বান করা হয়। নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আন্ওয়ারুস সালাম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির দপ্তর সম্পাদক ও দৈনিক মানবজমিনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মো. রাশিম মোল্লাকে নিয়ে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গত ২ মার্চ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনে কয়েকজনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর কয়েক দিন ধরে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তবে নির্বাচন কমিশন গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরই বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল, সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন, যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রুমি, সুমন সরদার, জাফর আহমেদ ও পরাগসহ কয়েকজন নেতৃত্ব দেন।
হামলায় কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক মো. জুনায়েত শেখ, যুগান্তরের সাকেরুল ইসলামসহ অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন বলে জানা গেছে। এ সময় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জয় সাহা সাংবাদিক জান্নাতুন নাইমকে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও উঠেছে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, হামলার আগে ক্যাম্পাসের বেশির ভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। উপাচার্যের কার্যালয়ের ক্যামেরা ছাড়া অন্যগুলো তখন বন্ধ ছিল বলে দাবি তাঁদের। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা আইটি দপ্তরে গিয়ে এ কাজটি করান।
সাংবাদিক সমিতির সদস্য জান্নাতুন নাইম বলেন, ঠিকাদার রুমি আওয়ামী লীগের দোসর। তিনি চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাচনও করেছেন। বর্তমানে ছাত্রদল নেতারা টেন্ডারের কমিশনের টাকার আশায় রুমির কথায় চলছেন এবং সাধারণ সাংবাদিকদের ওপর হামলা করছেন। এত ঠিকাদার থাকতে আওয়ামী লীগের দোসরকে কেন বারবার ঠিকাদারের কাজ দেওয়া হবে—এ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।”
সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহতাব হোসেন লিমন বলেন, সমিতিতে হামলার পর আমি উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে স্ক্রিনে ক্যাম্পাসের সব সিসিটিভির ফুটেজ বন্ধ দেখতে পাই। উপাচার্যকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সমিতিতে হামলার কিছুক্ষণ আগেই ক্যাম্পাসের সব সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
হামলার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, এ হামলার জন্য বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতা অধ্যাপক রইস উদ্দিন সরাসরি জড়িত। কারণ তিনি নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন বন্ধ করতে বলেছেন। তাঁর এই হুমকির পরই সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে। আরও পরিষ্কার হয়েছে, গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ধামাচাপা দিতে নাটক সাজিয়ে ছাত্রলীগের নেতা পরিচয়ে কয়েকজনকে ন্যাশনাল হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ (৪৫ দিনের আহ্বায়ক কমিটি দেড় বছর ধরে বহাল) কমিটি ভেঙে দিয়ে চাঁদাবাজিমুক্ত ছাত্রনেতাদের দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হোক। পাশাপাশি বিএনপিপন্থী শিক্ষক রইস উদ্দিনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এবং আওয়ামী লীগের দোসর ঠিকাদার রুমির টেন্ডার লাইসেন্স (লাইসেন্স নং–০৪২৯৩৬) বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আইটি পরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ওমর ফারুক রুমির বক্তব্য জানা যায়নি। একাধিকবার ফোন দিয়েও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।