২০২৫ সালে সিলেটসহ বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে হত্যা, গুলিবর্ষণ, অপহরণ ও পুশইনের মতো সহিংস ঘটনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বছরজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও ভারতের সশস্ত্র নাগরিকদের গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৪ জন নিরীহ বাংলাদেশী। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আরও ৩৮ জন বাংলাদেশী নাগরিক।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সীমান্ত সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে সীমান্তে বাংলাদেশীদের নিহত হওয়ার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। নিহতদের মধ্যে শুধু সিলেট সীমান্ত এলাকাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সিলেট সীমান্ত ছিল ভারতীয় বাহিনীর বিশেষ টার্গেট। সাম্প্রতিক পুশইনের প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাও ঘটেছে এই অঞ্চল দিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয়রা ১৪ জন বাংলাদেশীকে অপহরণ করে। এর মধ্যে চারজন ভাগ্যক্রমে ফিরে এলেও বাকিদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। একই বছরে সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা, ভারতীয় ও বাংলাদেশী নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেয় বিএসএফ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে নিহত ৩৪ জনের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে আরও অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশী গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন। পাশাপাশি সিলেট সীমান্ত এলাকায় ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হাতে অন্তত ১৩ জন বাংলাদেশী নিহত হন।
বিজিবির একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিবছরই ভারত সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।
এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ভারত কর্তৃক ‘পুশইন’-এর ঘটনায়। বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে অন্তত ২ হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে ভারত। এর পাশাপাশি সীমান্তে ড্রোন উড়ানো, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তে অব্যাহত প্রাণহানি ও সহিংসতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা প্রাণহানির ঘটনায় সীমান্তবর্তী জনপদে নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।