ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে নেপালের অন্তত তিনটি জেলা। স্থানীয় সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) দেশটির ভুটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় বন্যায় নিহতের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ জন।
এদিকে এমন আকস্মিক বন্যার পেছনে কারণ খুঁজতে শুরু করেছেন আবহাওয়া ও ভূতত্ব বিজ্ঞানীরা। প্রাথমিকভাবে একটি শক্তিশালী তুষার ও ভূমিধসের ঘটনাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
দেশটির স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমবাহের বিশাল একটি অংশ পাহাড় থেকে ধসে লহেন্দে খোলা নদীতে পড়ে এর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে তৈরি বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও কাদা-ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে নেমে এসে ভুটেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। তবে ঠিক কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ পানি জমা হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
খবরে বলা হয়েছে, আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। দেশটির তিনটি জেলায় এ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়া জেলার রাসুওয়াগাধি এলাকায় বুধবার বেলা বাড়ার আগেই আকস্মিক এ বন্যা আঘাত হানে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ভুটেকোশি নদীর উপনদী লহেন্দে নদীর প্রবাহ একটি তুষারধসের কারণে আটকে যাওয়ার পর হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসে। প্রথমে তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন তিমুরে এলাকায় আঘাত হানে বন্যার পানি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জনবসতিপূর্ণ ওই এলাকার বড় একটি অংশ পানিতে ভেসে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই এলাকায় বৃষ্টিপাতের কোনো খবর ছিল না। ফলে আকস্মিক এ দুর্যোগের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো আগাম সতর্কতাও ছিল না। প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকার মধ্যেই তাদের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়।
ঘটনার সময় বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। পরে সংস্থাটি জানায়, এটি প্রকৃতপক্ষে ভূমিকম্প ছিল না; পাহাড়ের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিধস থেকেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল। ভূমিধসটির শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল মনে করছে, ওই সময় হিমবাহের বিশাল একটি অংশ পাহাড়ের ঢাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। বরফ ও পাথরের এই বিশাল স্রোত লহেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। নদীটি ভুটেকোশি নদীর একটি উপনদী, যা চীন থেকে নেপালের দিকে প্রবাহিত হয়েছে এবং অনেক জায়গায় গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল শুগার, যিনি বিজ্ঞানীদের ওই দলের সঙ্গে কাজ করছেন, তিনি সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ঘটনাটির পুরো কারণ নিশ্চিত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তার ধারণা, পাহাড় থেকে দ্রুত নেমে আসা বরফ ও পাথরের স্রোত পথে থাকা মাটি ও পলিমাটি সঙ্গে নিয়ে নদীতে পড়ে। বর্ষাকাল হওয়ায় ওই মাটি আগে থেকেই পানিতে সিক্ত ছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি একসঙ্গে ভাটির দিকে ধেয়ে যায়।
নেপালের পানিবিদ্যা ও আবহাওয়া অফিসের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান বিনোদ পরাজুলির দেওয়া প্রাথমিক তথ্যও এ ধারণার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া ঘটনার আগে ও পরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মিতেরি সেতুর প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। এতে সেখানে সাময়িক একটি জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে পানি প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে।
পরাজুলি বলেন, তুষার ও ভূমিধসের পর ধ্বংসাবশেষ মিলে একটি জলাধার তৈরি হয়েছিল। পরে সেটি ভেঙে যায় এবং আকস্মিকভাবে পানি ছেড়ে দেয়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ মিশে যাওয়ায় বন্যার ধ্বংসক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।
তার মতে, শুধু স্বচ্ছ পানি হলে এতটা ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি নাও হতে পারত। কিন্তু পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ মিশে যাওয়ায় পানির গভীরতা ও স্রোতের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এদিকে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল কি না, সে সম্ভাবনাও শুরুতে বিবেচনা করা হয়। হিমালয় অঞ্চলে এমন ঘটনা নতুন নয়। হিমবাহ গলে পাহাড়ের উঁচু এলাকায় বিশাল জলাধার তৈরি হয়। এসব হ্রদকে আটকে রাখা বরফ বা পাথরের বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করতে পারে। একে বলা হয় গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা।
তবে এবারের বন্যার ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। জার্মানির ফ্রেই ইউনিভার্সিটি বার্লিনের ভূ-রূপবিদ্যার অধ্যাপক ভলফগ্যাং শোয়াংহার্ট সিএনএনকে বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া স্যাটেলাইট ছবিতে বন্যার উৎসের উজানে বড় কোনো হিমবাহ হ্রদের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। ফলে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে নেপালের জলবায়ু গবেষক ও কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়স্থ কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, কোনো হিমবাহ হ্রদ ভেঙে পড়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কারণ ওই অঞ্চলে অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের ৮ জুলাই একই ভুটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। সে সময় নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছিল, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লহেন্দে নদীতে একটি হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার কারণেই বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করেও ওই বন্যার সঙ্গে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
এবারের বন্যায় ভারী বৃষ্টিপাতকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা আরও কম। নেপালের পানিবিদ্যা ও আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার রাসুওয়া এলাকায় কোনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি।
স্যাটেলাইট ও আবহাওয়া কেন্দ্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিএনএন ওয়েদারের এক বিশ্লেষণ বলছে, গত এক সপ্তাহে ওই এলাকায় ব্যাপক ও তীব্র বৃষ্টিপাতের কোনো প্রমাণ নেই।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তবে এখন বর্ষাকাল চলায় ওই অঞ্চলে নদীগুলো স্বাভাবিকভাবেই বেশি পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। গত কয়েক মাসের তুষার ও বরফ গলার পানি এবং মৌসুমি বৃষ্টির কারণে নদীর পানির স্তর তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভূমিধসের পর নেমে আসা বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনও এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে।
সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর ওই অঞ্চলের হিমবাহে বরফ হারানোর হার দ্বিগুণ হয়েছে। এতে পাহাড়ি ঢাল ও হিমবাহগুলো আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। প্রায় ২০ লাখ মানুষ এসব হিমবাহের নিচের দিকে বসবাস করায় তাদের জন্য ঝুঁকিও বাড়ছে।
ভূতত্ত্ববিদ শুগারের মতে, তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বরফ ও পাহাড়ের ফাটলে পানি ঢুকে সেগুলো দুর্বল করে দিতে পারে। এতে হিমবাহ বা পাহাড়ের বড় অংশ হঠাৎ ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে এবারের ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক নিশ্চিত করতেও আরও গবেষণা প্রয়োজন।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র শান্তি মহাত কাঠমান্ডু পোস্টকে জানিয়েছেন, তারাও একটি নদীর প্রবাহ তুষারধসে আটকে যাওয়ার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) চীনের বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পাওয়ার পর তা নেপালকে জানিয়েছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
ফলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হলো পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ধস। এতে লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে সাময়িক জলাধার তৈরি হয়ে থাকতে পারে এবং পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভুটেকোশি নদীর দিকে ধেয়ে আসে।
তবে বিপুল পরিমাণ পানি ঠিক কোথা থেকে এলো এবং হিমবাহ হ্রদ এতে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের তদন্তের প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট ও সিএনএন







