প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে দেশটির গণমাধ্যম এবং সাবেক কূটনীতিকরা একধরনের অস্থির সময় পার করছেন। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান কখন কোন দেশ সফরে যাবেন, তা নির্ধারণ করার এখতিয়ার সম্পূর্ণ নিজের। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে, আমন্ত্রণ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল দৌড়ে সে দেশে যাওয়া। যেমনটি আমরা পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়গুলোতে দেখেছি।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনে বাংলাদেশের ওপর ভারত একধরনের প্রভুত্ব কায়েমের প্রচেষ্টা চালিয়েছে—এটি এ দেশের মানুষের কাছে কোনো অস্পষ্ট বিষয় ছিল না। বাংলাদেশের মানুষের সব ধরনের অধিকার হরণ ও নিপীড়নের পক্ষে ভারতের জোরালো সমর্থন ছিল। জনসমর্থনহীন একটি সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে দিল্লি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সব ধরনের স্বার্থ আদায় করে নিয়েছে। এ সময় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার স্বাধীন সত্তা হারিয়ে ফেলেছিল। শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন দুই দেশের সম্পর্ককে তুলনা করেছিলেন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সঙ্গে। যেন দুই দেশের মধ্যে কোনো স্বার্থগত সম্পর্ক নেই। ভারত যা চেয়েছে, বাংলাদেশ শুধু তা পূরণ করে গেছে। খোদ শেখ হাসিনা নিজে বলেছিলেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তা চিরদিন মনে রাখবে।’
বাস্তবতা হলো, এ সময়ে বাংলাদেশের ছিল না কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে পড়েছিল দিল্লির সাউথ ব্লকের একটি এক্সটেনশন মাত্র। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ শুধু জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি, পুরোপুরি ভারতনির্ভর একটি দলে পরিণত হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের আগে ২০২৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোনো রাখঢাক না করে সাভারে এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘দিল্লির আছে, আমরা আছি।’ অর্থাৎ জনগণের সমর্থন নয়, দিল্লির সমর্থনই ছিল তাদের ক্ষমতায় থাকার একমাত্র গ্যারান্টি।
ভারতের সমর্থনে ক্ষমতা নবায়নের ছয় মাস পর, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে ভারতের প্রভুত্বের অবসান ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ভারত নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। হাসিনার দাসত্বের নীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ শুরু করে। দেড় দশকে বাংলাদেশকে যেভাবে একটি ক্লায়েন্ট স্টেটে পরিণত করা হয়েছিল, সেখান থেকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে থাকে।
হাসিনার পতনের চেয়েও বাংলাদেশের এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল দিল্লির কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত। যে কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারত শুধু স্বাভাবিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করেনি, ভারতের গণমাধ্যম, থিংকট্যাংক ও সাবেক কূটনীতিকরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চরিত্র হননের হীন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। এমনকি পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাদের চেয়েও ভারতের গণমাধ্যমের মুখগুলো ছিল ড. ইউনূসের প্রতি চরম খড়্গহস্ত। দেশের ভেতরে থাকা ভারতের সফট পাওয়ার হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যম ও থিংকট্যাংকগুলো একসময় ড. ইউনূসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও ভারতনীতির কারণে তিনি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এখনো ড. ইউনূস এসব গণমাধ্যমের প্রধান টার্গেটে হয়ে আছেন।
ভারত আশা করেছিল, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর নির্বাচিত সরকার ধীরে হলেও ভারতের স্বার্থপূরণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে—গণঅভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক চিন্তার শুধু পরিবর্তন ঘটায়নি, তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে এনেছে। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনভাবে চলার নীতি থেকে বিচ্যুত করার যেকোনো প্রচেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের এই মনস্তত্ত্ব দিল্লির প্রভুত্ববাদীরা কখনো বুঝতে পারবে না।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতারা ভেবেছিলেন, হাসিনার মতো তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি হয়তো কোনো প্রশ্ন ছাড়াই দিল্লির পথে রওনা হয়ে যাবেন। এ কারণে বিমসটেকের মতো ভারতনিয়ন্ত্রিত একটি আঞ্চলিক সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে পলাতক হাসিনাকে দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ভারত সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাসিনা এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ যে পুরোপুরিভাবে ভারতের দ্বারা পরিচালিত একটি রাজনৈতিক দল, সে দেশে বসে দলটির নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা থেকে তা স্পষ্ট।
দণ্ডিত একজন অপরাধী ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, দিল্লি সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ভারতে পলাতক মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত অপরাধীদের ফেরত চাওয়া হয়। বাংলাদেশ এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় আছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে তিনি ভারত সফরে যাবেন।
এরপর থেকে আমরা দেখছি, ভারতের গণমাধ্যম ও সাবেক কূটনীতিকরা বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় মেতে উঠেছেন। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দেশে থাকা আওয়ামী প্রচারবিদরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল আমন্ত্রণ পাওয়া মাত্র দিল্লি সফরে যাওয়া। যেমনটি হাসিনা করতেন। বাংলাদেশের সুবিধামতো সময়ে সফরে যাওয়ার কথা বলে ভারতকে নাকি অপমান করা হয়েছে। আগামী এক বছরেও আর মোদির সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে, ভারতীয়রা ভয় দেখাচ্ছেন, ভারত যদি ডিজেল আর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তখন বাংলাদেশের কী হবে?
তারা ভুলে গেছেন, বাংলাদেশকে কোনো কিছুই ভারত বিনা পয়সায় দেয় না। প্রতিটি পণ্য কিনে নিতে হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ যে ডিজেল কিনে থাকে, তা মোট চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগেরও কম। বাংলাদেশ আরো অনেক দেশ থেকে ডিজেল কিনে থাকে। অন্যদিকে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনা নিয়ে এ দেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। আজকে বিদ্যুৎ খাতে যে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণ ক্যাপাসিটি চার্জসহ অতিরিক্ত দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছিল মোদি সরকারকে ঘুস দেওয়ার অংশ হিসেবে। এ ছাড়া, ত্রিপুরায় পালাটানায় ভারত যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে, তার যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের তিতাস নদ ভরাট করে রাস্তা তৈরি করে। এসব যন্ত্রপাতি আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে বিনাশুল্কে ভারতে নেওয়া হয়েছিল।
ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় নতুন এক ইস্যু তৈরি হয়েছে ত্রিদেশীয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। এ নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আর গণমাধ্যমের যেন ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নতুন যে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, তাতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। এ নিয়ে বাংলাদেশকে কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের পক্ষ থেকে রিয়াদ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে বর্তমান সরকার। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। ভারতের সঙ্গে কোন দেশের সম্পর্ক কেমন, তা বিবেচনা করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি চলতে পারে না। ত্রিদেশীয় জোটে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়, তাহলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের যোগ দেওয়া উচিত। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান বা তুরস্কের সম্পর্ক খারাপ আছে বলে বাংলাদেশ এসব দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জোটে যোগ দিতে পারবে নাÑদিল্লির এমন আশা করা উচিত নয়। সার্কের মতো একটি সহযোগিতামূলক সংস্থাকে অকার্যকর করে ভারত প্রমাণ করেছে আঞ্চলিক যেকোনো জোটে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা ভারতের নেই। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় ক্ষুদ্র স্বার্থের ভিত্তিতে। যেকোনো জোট গঠন ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যে উদার নীতির প্রয়োজন, তা ভারতের নেই। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে পরিত্যাগ করে ইসরাইলকে সহায়তা করেছে, তা থেকে প্রমাণ হয় দেশটি তার মিত্রদের কাছে কতটা অবিশ্বস্ত।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে দিল্লিতে যে বাংলাদেশবিরোধী শোরগোল চলছে, তা মূলত শেখ হাসিনা আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রভুত্ব হারানোর বেদনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শুধু হাসিনার পতন হয়নি, বাংলাদেশের ওপর দিল্লির আধিপত্যেরও পতন হয়েছিল। এখন তারেক রহমানের সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে পুরোনো অবস্থা ফিরে আনতে চাইবে ভারত। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যে আত্মমর্যাদা ফিরে পেয়েছে, তা থেকে সহজে আর সরে আসবে না। তারেক রহমানের সরকারের সে উপলব্ধি আছে বলে মনে হয়।







