মাছে গন্ধ হয় যে কারণে, যেভাবে দূর করবেন গন্ধ

Post Image

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক বোঝাতে বহুল ব্যবহৃত এই প্রবাদটি যেন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। প্রতিদিনের খাবারে নানা ধরনের মাছের উপস্থিতি তাই স্বাভাবিক। চাহিদা মেটাতে গত কয়েক দশকে দেশে মাছ চাষও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর ফলে মাছের উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়ছে।

তবে বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে রান্নার পর অনেকেই এক ধরনের কাদা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ অনুভব করেন। লবণ, লেবু, হলুদ কিংবা আদা-রসুন দিয়ে মাছ ধোয়ার পরও অনেক সময় সেই গন্ধ পুরোপুরি দূর হয় না। এই দুর্গন্ধের কারণ কী—তা খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন দেশের মৎস্যবিজ্ঞানীরা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদন ও চাষে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান আড়াই শতাংশের বেশি। অর্থাৎ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশের মৎস্য খাত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও ভোক্তার কাছে মাছের স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

চাষের মাছে গন্ধের কারণ কী?

গবেষকদের মতে, চাষের মাছে কাদার মতো গন্ধের পেছনে রয়েছে দুটি বিশেষ জৈব যৌগ। মাছের শরীরে থাকা চর্বি, চামড়ার নিচের লাল মাংসসহ বিভিন্ন অংশে এসব যৌগ জমে যায়। ফলে মাছ বারবার ধোয়া বা রান্না করলেও দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানিয়েছেন, কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে এসব গন্ধযুক্ত উপাদান তৈরি হয়।

তার ভাষায়, ‘বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় একজিনো ব্যাকটেরিয়া, মিকজো ব্যাকটেরিয়া এবং সায়ানো ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে দুই ধরনের কম্পাউন্ড-জিয়োসমিন এবং ২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল নামে জৈব যৌগ নিঃসৃত হয়।’

তার মতে, মাছের শরীরে চর্বি থাকা অংশ এবং চামড়ার নিচে থাকা রেড মাসেলে এসব যৌগ জমে গিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে।

তিনি বলেন, ‘মাছের শরীরে চর্বি যেখানে থাকে অথবা মাছের দেহের ওপরের যে চামড়া, যেখানে রেড মাসেল আছে সেসব জায়গায় জমা হয় দুর্গন্ধটা তৈরি হয়।’

কোন পরিস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়া বাড়ে?

গবেষকেরা বলছেন, পুকুরে মাছের গন্ধ তৈরির পেছনে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—অতিরিক্ত খাবার দেওয়া, জলাশয়ের তুলনায় বেশি মাছ রাখা এবং নিয়মিত পানি পরিবর্তন না করা।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য পুকুর থাকলেও সব পুকুরের পানি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। আবার খরচের কারণে অনেক চাষি নিয়মিত পানি পরিবর্তন করেন না।

অধ্যাপক হক বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্রামে অসংখ্য পুকুর আছে, অনেক জায়গায় পানি বের করে পুরনো পানি পরিবর্তন করার সুযোগ আছে, অনেক জায়গায় নেই। অনেকে খরচের কারণেও পানি পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেন না।’

পানি দীর্ঘদিন পরিবর্তন না করলে পুকুরের তলায় কাদা, বর্জ্য ও অন্যান্য জৈব পদার্থ জমতে থাকে। অনেক সময় অতিরিক্ত খাবারও মাছ পুরোপুরি খেতে পারে না। সেই খাবার পুকুরের তলায় পচে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় মাছের মলমূত্র। এসব পচনশীল জৈব পদার্থই গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘যত খাবার দেওয়া হচ্ছে সেটি মাছ পুরোপুরি গ্রহণ করে না ফলে অতিরিক্ত খাবার পানিতেই পঁচে যাচ্ছে। মাটি এবং পানির গুণাগুণের ওপরই মূলত মাছের স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে।’

এ কারণেই নদী বা প্রবাহমান পানির মাছের মধ্যে সাধারণত চাষের মাছের মতো কাদার গন্ধ পাওয়া যায় না।

গন্ধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কি আছে?

চাষের মাছের গন্ধ নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি এর সঙ্গে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের রুই, মৃগেল, সিলভার কার্পসহ কয়েক প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করেন।

ওই গবেষণায় মৃগেল মাছের শরীরে ক্রোমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া যায়।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, খাবারে ক্রোমিয়ামের সহনীয় মাত্রা শূন্য দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। এর বেশি হলে তা কিডনি ও যকৃতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

গবেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার না করলে সেখানে ভারী ধাতু ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জমতে পারে। তাই অন্তত তিন বছর পরপর পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত চাষপদ্ধতিকে ‘অ্যাকুয়াকালচার ভায়োলেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তার ভাষায়, ‘মাছ চাষের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগুলো মানা হচ্ছে কী-না মাঠ পর্যায়ে এটি পর্যবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বেশি লাভের আশায় মৎস্য চাষীরা স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল মানছেন না।’

গন্ধমুক্ত মাছ উৎপাদনে নতুন পদ্ধতি

চাষের মাছের দুর্গন্ধ কমাতে মৎস্যবিজ্ঞানীরা এখন ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ নামে একটি বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। এই পদ্ধতিতে পানির গুণমান ঠিক রাখতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ক্লোরেলার মতো মাইক্রোঅ্যালগি ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে অ্যামোনিয়া ও ক্ষতিকর গ্যাস কমানো এবং অতিরিক্ত সার ও নিম্নমানের ফিডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই পদ্ধতিতে প্রচলিত পুকুরের পরিবর্তে বিশেষ পানির ট্যাংক ব্যবহার করা হয়। সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্জ্য অপসারণ, পানি পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার এবং সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, এই ব্যবস্থায় মাছের মল, না খাওয়া খাবার ও অন্যান্য পচনশীল জৈব পদার্থ পানির প্রবাহের সঙ্গে ট্যাংকের মাঝের পাইপ দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর সুযোগ কমে যায়। পাশাপাশি এয়ার ব্লোয়ারের মাধ্যমে সারাক্ষণ অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়, ফলে মাছ তুলনামূলকভাবে চাপমুক্ত থাকে এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে।


ইতোমধ্যে টেংরা, গুলশা, পাবদা ও শিং মাছ চাষে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে সাফল্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পটির প্রধান গবেষক মনিরুজ্জামান।


তিনি বলেন, এই পদ্ধতিতে ওষুধ ছাড়াই দ্রুত মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি মাছের স্বাদ, গন্ধ ও মানও ভালো রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে জায়গা ও খরচ দুটিই কমানো যায়।


মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্টকিং ডেনসিটি অপ্টিমাইজ করা। এখানে শিং মাছের ক্ষেত্রে ৮০ কেজি থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রোডাকশন পেয়েছি। ক্যাটফিশের স্বাভাবিক কালচার সাত মাস, কিন্তু আমরা ১২০ দিনেই কোনো ধরনের মেডিসিন ইউজ না করে হারভেস্টে নিয়ে আসছি। এ পদ্ধতিতে মাছের মধ্যে কোনো গন্ধ থাকে না, কাদার গন্ধ থাকে না এবং এটার কালারটা খুবই সুন্দর। খুব কম জায়গায় অধিক মাছ উৎপাদন করা যায়।’

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি শুধু বাণিজ্যিক খামারেই নয়, শহরের বাড়িতেও সীমিত জায়গায় মাছ চাষের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভোক্তার কাছে ভালো স্বাদ ও গন্ধের নিরাপদ মাছ পৌঁছানোর সম্ভাবনাও বাড়বে।

সর্বশেষ খবর

মাছে গন্ধ হয় যে কারণে, যেভাবে দূর করবেন গন্ধ

পরীক্ষায় ফেল করেও যারা আজ সফল

গর্ভাবস্থায় ঠান্ডা পানি পান করলে কী হয়?

প্রতিদিন যে ৩ ফল খেলে চুল পড়া কমে

আজ ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? কেন ক্ষতিকর, কীভাবে বাঁচা সম্ভব

সকালে খালি পেটে যেসব খাবার খেলে শরীর সুস্থ থাকে

মেয়েকে বাঁচাতে ১৪তলা প্রমোদতরী থেকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাবা