কার্যকরের আগেই সিন্ডিকেটের কবলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

Post Image

অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন ও সেখানে কিছু জনবল এরই মধ্যে নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু সচিবালয় এখনো কার্যকর হয়নি। কার্যকর হওয়ার আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ঘিরে বিচারকদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের ইশারায় সচিবালয়ের সচিবসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধোভোগী একটি শ্রেণিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতির অগোচরে এমন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা অধস্তন আদালতের বিচারকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ তৈরির পাশাপাশি শঙ্কাও তৈরি করেছে।


জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে বিচারকদের মধ্যেও। গত বুধবার সারা দেশের বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের একটি জুম মিটিংয়েও এই অধ্যাদেশ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত এসেছে। অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কার্যালয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয়ে তাদের অবহিত করতে ওই বৈঠক ডাকা হয়েছিল। সেখানে কিছু বিচারক অধ্যাদেশটির ৭ নম্বর ধারার বিরোধিতা করেন, যেখানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। কেউ কেউ এই ৭ নম্বর ধারা কার্যকর না করে আপাতত সচিবালয় বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধান আপাতত যেভাবে আছে, সেভাবেই রাখার পক্ষে তারা কথা বলেন। আবার কেউ কেউ অধ্যাদেশটি এই অধিবেশনেই পাস করার দাবি তোলেন।



বিচারকরা বলছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের যাবতীয় কার্যক্রম পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশের ৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিচারকদের বদলি, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টি একক হাতে চলে গেলে, সেই প্রক্রিয়াটির স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে। তা ছাড়া বিচারিক স্বাধীনতা বলতে বিচারকদের চাকরির নিশ্চিয়তা, বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা এবং আইন ও নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার শর্তের কথা বলা হয়েছে। যেসব শর্তের অধিকাংশই এরই মধ্যে পালিত হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকেই। তারা বলছেন, বর্তমানে বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, শৃঙ্খলা বিধান ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার বিষয়গুলো একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগ হচ্ছে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মতো একটি শক্তিশালী স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে। এ ছাড়া বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জুডিসিয়াল সার্ভিস বিধিমালার (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্তাবলি) মাধ্যমে। এই বিধিমালা অনুযায়ী, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় হিসেবে আইন মন্ত্রণালয় থেকে যে কোনো বিচারকের বদলি, পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানো হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এককভাবে একজন সহকারী জজকেও বদলির ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই। এ ছাড়া বিচারকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে থাকে জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কশিমন। এ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় দাবির পেছনে যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আর কেউ কেউ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তারা বলছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকরা সুপ্রিম কোর্টের অধীন্যস্ত হলেই বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারবে অথবা বিচার বিভাগ সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারবে—এমন ধারণা শতভাগ সঠিক নয়। এটা সম্ভব হলে উচ্চ আদালতই সেটা করে দেখাতে পারতেন। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের পদোন্নতি বা বদলির কোনো বিষয় নেই। সরকার চাইলেই তাদের অপসারণ করতে পারে না। তার পরও উচ্চ আদালতের অনেক বিচারপতি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি।


আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালত স্বাধীন হলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দু-একজন আসামির জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেনি। তারা জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করেননি। উল্টো অধস্তন আদালতের দেওয়া সাজা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে দ্বিগুণ করা হয়েছে। ফাঁসির আদেশ দেওয়ার বিধান না থাকলেও আইন সংশোধন করে ফাঁসির আদেশ দেওয়ার মতো অপকর্মের বৈধতা দিয়েছেন। দেশের সব দল-মতের কাছে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচারের পথরুদ্ধ করতে বাতিল করেছেন। শুধু তাই নয়, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পরিবর্তন করেছেন রাজনৈতিক চাপের মুখে। ওই রায়ে পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা থাকলেও তিনি ওই রায় পরিবর্তন করেন। চোখ বন্ধ করে সরকারের অবিচারকে, ফ্যসিজমকে, গণতন্ত্রহীনতাকে সমর্থন করে গেছেন উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা। বিনিময়ে অবসর-পরবর্তী সময়ে প্রেষণে ভালো ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন অনেকেই। শুধু তাই নয়, বিচারপতিদের কেউ কেউ নিজেদের শপথবব্ধ রাজনীতিবিদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।


বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সময়ে উচ্চ আদালতের এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে, কাগজে-কলমে স্বাধীনতা দিলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার চেয়ে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি তথা বিচারকদের ব্যক্তিত্ব শিক্ষা, প্রজ্ঞা, মেধা, দক্ষতা, দেশপ্রেম ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একজন বিচারকের নৈতিক মান, শিক্ষা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচারের প্রতি তার ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কমিটমেন্ট। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে একজন বিচারকের মানসিক পরিবর্তন আগে প্রয়োজন। তাই ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না করেই, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে স্বতন্ত্র বিচারকদের বিচার বিভাগের নেতৃত্বের ইচ্ছা মেনে চলতে বাধ্য করা হতে পারে। যার ফলে আইনের শাসন বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাবে দেখা দিতে পারে।


এসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বাংলাদেশ আইন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, ‘২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। ধারণা করা হতো, পৃথক ঘোষণার পর বিচার বিভাগ জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে। কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টো মামলা জট বেড়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়েছে। এরপর প্রত্যাশা ছিল পৃথক সচিবালয় হলে হয়তো বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করবেন। কিন্তু দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠার শুরুতেই বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের সুবিধাভোগীরা এই সচিবালয়ে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া লোকজনকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে বসানো হয়েছে। এভাবে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিয়োগ হলে পৃথক সচিবালয়ও নিরপেক্ষভাবে কতটুকু কাজ করতে পারবে—সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে বিচারকদের আগে মনের দিক থেকে স্বাধীন হতে হবে। নিরপেক্ষ বিচার করার জন্য নৈতিকতা, সৎ সাহস থাকতে হবে, ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে বিচারকদের কাজ করতে হবে। পৃথক সচিবালয়ের চেয়ে বিচারকদের মানসিকভাবে স্বাধীন হওয়া জরুরি।


‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ঘিরে সিন্ডিকেট’


সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ঘিরে বিচারকদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। প্রধান বিচারপতির অগোচরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের প্রভাবে এখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগী ও একটি বিশেষ মতাদর্শের লোকজন বলে জানা গেছে। সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। ২০২০ সালে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের দায়রা জজ ছিলেন। তখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে তখন ‘জাতির পিতার সম্মান, রাখব আমরা অম্লান’ স্লোগানে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়। দেশের অন্য কোথাও বিচারকদের এমন সমাবেশ দেখা না গেলেও চট্টগ্রামে বিচারকদের নিয়ে আয়োজিত ওই সমাবেশে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।


তথ্য বলছে, শেখ আশফাকুর রহমানের বাড়ি সাতক্ষীরায়। তার বাবার নাম অ্যাডভোকেট দেলদার রহমান। তিনি সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্যানেল থেকে দুবার সভাপতি হয়েছিলেন। এ ছাড়া দেলদার রহমান ছিলেন সাতক্ষীরা উপজেলা আওয়ামী লগের সহ-সভাপতি। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সদস্য আশফাকুর রহমান বিচার বিভাগে আওয়ামী তন্ত্র চালিয়েছে ব্যাপকভাবে। শুধু প্রতিবাদ সমাবেশে অংশগ্রহণই নয়, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সুবিধাভোগীদের অন্যতম একজন। আওয়ামী লীগ আমলে আইন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট, চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ, সিলেট মহানগর দায়রা জজসহ গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় ছিল বিচারক আশফাকুর রহমানের পোস্টিং। এখানেই শেষ নয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাত্র তিন মাস আগে ২০২৪ সালের ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পক্ষে জুডিসিয়াল ক্যু করার চেষ্টাকারী সাবেক প্রধান বিচারপতির ওবায়দুল হাসানের সঙ্গে আমেরিকা সফর করেন তিনি। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় বিচারকদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পরিচালক পদে পদায়ন পান। কিছুদিনের জন্য আশফাকুর রহমানকে সিলেটের জেলা জজ হিসেবে পাঠানো হলেও তিনি আবার ঢাকায় লিগ্যাল এইডের পরিচালক হিসেবে পদায়ন নিয়ে চলে আসেন। এবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের শীর্ষ পদটিও বাগিয়ে নেন তিনি। সচিবালয়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে বিতর্কিত ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিচারকরা। সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শুধু সচিবই নন, এখানে একাধিক অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ পেয়েছেন যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত এবং একটি বিশেষ মতাদর্শের অনুসারী। তাদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত সচিব শারমিন নিগার। বিগত আমলে তিনি তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বিগত সরকারের আমলে তিনি ঢাকা কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। বিচারাঙ্গনে তিনি সাবেক আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই পরিচিত।


আরেক অতিরিক্ত সচিব মো. রুহুল আমিন ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে এবং ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার আদালতে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২-২৩ সালে তিনি ছিলেন রাজবাড়ির জেলা জজ। এরপর তাকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নিজ জেলা কুষ্টিয়ার জেলা জজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। সেখান থেকে তাকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।


যুগ্ম সচিব মঞ্জুর কাদের বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে ঢাকায় দুই দফায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন নোয়াখালীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। আরেক যুগ্ম সচিব হারুন রেজা দীর্ঘদিন সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত ছিলেন। এরপর তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়ে। এবার আবার তাকেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে নিয়োগ করা হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর ভাগ্নি হিসেবে কর্মক্ষেত্রে পরিচয়দানকারী সাদিয়া আফরীন দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এই সচিবালয়ে।


সচিবালয়ে এখন পর্যন্ত নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫ কর্মকর্তার বেশিরভাগই সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী বলে জানা গেছে। পটপরিবর্তনের পর তারা জামায়াত সমর্থক বিচারকদের সঙ্গে মিশে ভালো ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক রেজিস্ট্রার মুন্সি মশিয়ার রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে সরকারবিরোধী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের জেলা জজ থাকাকালে বিচারকদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে যান। পটপরিবর্তনের পর সাবেক এই রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মিছিল ও ডিম নিক্ষেপ হয়েছিল। এ ছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্তদের দু-একজন এখনো সুপ্রিম কোর্টে বহাল তবিয়তে আছেন।


অভিযোগ রয়েছে—এসব কর্মকর্তা মিলে প্রধান বিচারপতিকে ভুল বুঝিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীদের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বসানোর কাজ করে যাচ্ছেন। এসব বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন বঞ্চিত মেধাবী বিচারকরা। একজন বিচারক কালবেলাকে বলেন, এভাবে ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের কারণেই মূলত সরকারও ক্ষুব্ধ। এ কারণেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের তালিকায় গেছে।


এসব ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে নিয়োগ নিয়ে বিচারকদের ক্ষোভের বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। এসব ব্যাপারে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিচারক মুন্সি মশিয়ার রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কেউ তাকে ফাঁসানোর জন্য এগুলো করছেন।


‘অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হবে সংসদে’


গত বছরের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে একটি সচিবালয় স্থাপন করা হয়েছে। এই সচিবালয়ে ১৫ জন কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। তবে বিচারকদের বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা এককভাবে এখনো সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়নি। এটা করতে হলে অধ্যাদেশটির ২ ধারা অনুযায়ী একটি সরকারি গেজেট ও প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। এ ছাড়া পুরো অধ্যাদেশটি বহাল রাখতে হলে সংসদের বর্তমান অধিবেশনেই আইন হিসেবে পাস করতে হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে। ফলে এই অধ্যাদেশে নানা ত্রুটি রয়েছে বলে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির বৈঠকে উঠে এসেছে। যে কারণে বর্তমান সরকার এই অধ্যাদেশ আপাতত বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন সংসদে আলোচনা হবে। অধ্যাদেশটির ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অধ্যাদেশটির ভাগ্যের ব্যাপারে সংসদেই সিদ্ধান্ত হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

সর্বশেষ খবর

আ. লীগ সরকারের সুরে সড়কমন্ত্রীর বক্তব্য: সংসদে সরকারি দলের এমপির অভিযোগ

সকল ধর্মাবলম্বীদের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো গোপন চুক্তি নেই: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

চাপ না নিতে পেরে দ্রব্যের দাম বাড়াতে হতে পারে: অর্থমন্ত্রী

হামের ভয়াবহতা করোনার চেয়ে কম নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জ্বালানির চাহিদা মেটাতে ডিজেল-অকটেন আমদানি করবে সরকার

ক্রিকেটারদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন বিসিবি সভাপতি

সর্বাধিক পঠিত

আনুপাতিক নাকি আসনভিত্তিক, কোন পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন

জেনারেল মইনকে চাকরির নিশ্চয়তা দেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখার্জি

বঙ্গোপসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নৌবাহিনীর বাৎসরিক মহড়া সমাপ্ত

প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি, বিজিবি মোতায়েন

গুমের মামলায় সেনা কর্তকর্তাদের পক্ষে লড়বেন না ব্যারিস্টার সরোয়ার

অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ ও গঠন প্রক্রিয়া বৈধ: আপিল বিভাগ

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের তদন্ত আজ থেকে শুরু

তিন মামলায় হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড

এক জেলাতেই প্রবাসী ভোটার ২০ হাজার