কিশমিশ দেখলেই অনেকের মনে হয়, এটি বুঝি শুধু মিষ্টি স্বাদের একটি খাবার। তাই কেউ কেউ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা থেকে কিশমিশ বাদও দিয়ে থাকেন। তবে শুকনো আঙুর থেকে তৈরি এই খাবারটি শুধু স্বাদ বাড়াতেই নয়, পরিমিত পরিমাণে খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিরও যোগান দিতে পারে।
পায়েশ, পোলাও, ফিরনি কিংবা বিভিন্ন মিষ্টান্ন সাজাতে কিশমিশের ব্যবহার বেশ পরিচিত। তবে এসব খাবারের বাইরেও কিশমিশ আলাদা করে খাওয়া যায়। এতে রয়েছে শর্করা, ফাইবার, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ফলে পরিমিত পরিমাণে কিশমিশ খাদ্যতালিকায় রাখার বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
কিশমিশে কী কী পুষ্টি আছে?
কিশমিশে ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন কে এবং অল্প পরিমাণে ভিটামিন সিসহ পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজ রয়েছে। পাশাপাশি এতে পলিফেনলস, ফ্ল্যাভোনয়েডস, ট্যানিন ও ক্যাটেচিনসের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগও পাওয়া যায়।
প্রতি ১০০ গ্রাম কিশমিশে শর্করার পরিমাণ প্রায় ৭৯ গ্রাম, ফাইবার ৩ দশমিক ৭ গ্রাম এবং ফ্যাট প্রায় ০ দশমিক ৫ গ্রাম। অর্থাৎ এতে শর্করা তুলনামূলক বেশি থাকায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
খাদ্যতালিকায় কিশমিশ রাখার ১০ কারণ
১. দ্রুত শক্তি জোগায়
কিশমিশে প্রাকৃতিক শর্করা থাকায় এটি শরীরে দ্রুত শক্তির জোগান দিতে পারে। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের পর পরিমিত কিশমিশ একটি সহজ স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যেতে পারে।
২. পুষ্টির ভালো উৎস
কিশমিশে থাকা বিভিন্ন খনিজ, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের স্বাভাবিক বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তাই পরিমিত পরিমাণে এটি দৈনন্দিন খাবারে পুষ্টির বৈচিত্র্য আনতে পারে।
৩. হৃদ্স্বাস্থ্যে সহায়ক
কিশমিশে থাকা পটাসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে কিশমিশ খাওয়াই হৃদরোগ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নয়।
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করে
কিশমিশে থাকা ফাইবার অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাদ্যের সঙ্গে কিশমিশ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
৫. হজমে সহায়ক
ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তাই পরিমিত কিশমিশ দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখলে হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে।
৬. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে
কিশমিশে থাকা পটাসিয়াম শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব ভারসাম্য রাখতে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। তবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে শুধু কিশমিশের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
৭. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
কিশমিশে ফাইবার রয়েছে, যা কিছুটা সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে পরিমিত পরিমাণে কিশমিশ স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকসের বিকল্প হতে পারে। তবে এতে শর্করা ও ক্যালরি ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বেশি খেলে উল্টো অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ হতে পারে।
৮. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে
কিশমিশে থাকা পলিফেনলসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে ফল ও শুকনো ফলকে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে রাখা উপকারী।
৯. হাড়ের স্বাস্থ্যে সহায়ক
কিশমিশে অল্প পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ রয়েছে, যা হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে হাড় শক্ত রাখতে শুধু কিশমিশের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে।
১০. আয়রনের কিছুটা জোগান দেয়
কিশমিশে আয়রন রয়েছে, যা শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজনীয়। তবে রক্তস্বল্পতা থাকলে শুধু কিশমিশ খেয়ে তা দূর করার চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কীভাবে খাবেন কিশমিশ?
কিশমিশ সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি সকালের সিরিয়াল, ওটস, দই, মিল্কশেক কিংবা বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে যোগ করা যায়। অনেকে রাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে কিশমিশ খান। ভিজিয়ে খাওয়া সুবিধাজনক হলেও এতে কিশমিশের পুষ্টিগুণ বিশেষভাবে বেশি শোষিত হয়, এমন দাবির শক্ত প্রমাণ নেই।
তাই ভেজানো বা শুকনো, যেভাবেই খান না কেন, মূল বিষয় হলো পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা।
প্রতিদিন কতটা কিশমিশ খাবেন?
কিশমিশে প্রাকৃতিক শর্করা ও ক্যালরি তুলনামূলক বেশি। তাই একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে অল্প পরিমাণে খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আছে বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন, তাদের কিশমিশ খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অ্যালার্জি বা কিশমিশ খাওয়ার পর কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা এড়িয়ে চলতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, কিশমিশ কোনো ‘ম্যাজিক’ খাবার নয়। তবে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে এটি ভালো একটি শুকনো ফল। তাই শুধু মিষ্টি স্বাদের কারণে কিশমিশকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমাণ বুঝে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।


