উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে থাকে। আবার হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে বা কমে গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলে মারাত্মক জটিলতা এমনকি জীবনহানিও ঘটতে পারে। তাই শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর না করে পরিবারের অন্তত একজনের রক্তচাপ মাপার প্রাথমিক নিয়ম জানা থাকা জরুরি।
বাড়িতে নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হতে পারে।
রক্তচাপ মাপতে কী কী লাগবে?
রক্তচাপ মাপার জন্য প্রয়োজন একটি রক্তচাপমান যন্ত্র (স্ফিগমোম্যানোমিটার) এবং একটি স্টেথোস্কোপ। বর্তমানে ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্রও পাওয়া যায়। তবে যন্ত্রটি সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে ভুল ফল আসতে পারে। তাই ব্যবহারের নিয়ম জানা জরুরি।
রক্তচাপ মাপার আগে যা করবেন
সঠিক ফলাফল পাওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
ব্যক্তি যেন অন্তত ৫ মিনিট স্বাভাবিকভাবে বিশ্রামে থাকেন।
রক্তচাপ মাপার ঠিক আগে ধূমপান, চা-কফি পান বা ব্যায়াম করা উচিত নয়।
মানসিক উত্তেজনা বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সময় রক্তচাপ না মাপাই ভালো।
হাত এমনভাবে রাখতে হবে যেন তা হৃদপিণ্ডের সমান উচ্চতায় থাকে।
যেভাবে রক্তচাপ মাপবেন
প্রথমে কাফটি কনুইয়ের ভাঁজ থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার ওপরে শক্ত করে লাগান। এরপর কনুইয়ের ভেতরের দিকে ব্র্যাকিয়াল ধমনীর ওপর স্টেথোস্কোপের ডায়াফ্রাম স্থাপন করুন।
কাফে বাতাস ভরে চাপ বাড়াতে থাকুন। এরপর ধীরে ধীরে চাপ কমাতে হবে। খুব দ্রুত চাপ কমালে সঠিক ফল পাওয়া যায় না।
চাপ কমার সময় স্টেথোস্কোপে যে শব্দ শোনা যায়, তাকে করটকফ (Korotkoff) শব্দ বলা হয়।
প্রথম শব্দ শোনা গেলে সেটিই সিস্টোলিক (উপরের) রক্তচাপ।
যে মুহূর্তে শব্দ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, সেটিই ডায়াস্টোলিক (নিচের) রক্তচাপ।
বর্তমানে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ নির্ধারণে শব্দ সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার পর্যায়কেই গ্রহণ করেন।
কোন রক্তচাপ স্বাভাবিক?
স্বাভাবিক < ১২০ এবং < ৮০ (মিঃ মিঃ পারদচাপ) প্রাক-উচ্চ রক্তচাপ ১২০-১৩৯ অথবা ৮০-৮৯ (মিঃ মিঃ পারদচাপ) উচ্চ রক্তচাপ (পর্যায়-১) ১৪০-১৫৯ অথবা ৯০-৯৯ (মিঃ মিঃ পারদচাপ) উচ্চ রক্তচাপ (পর্যায়-২ )> ১৬০ অথবা > ১০০(মিঃ মিঃ পারদচাপ) সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপের পর্যায় ভিন্ন হলে সর্বোচ্চ পর্যায়কেই গণনায় নিতে হবে। যেমন কারও রক্তচাপ ১৭০ / ৯৫ মিঃ মিঃ পারদ চাপ হলে তাকে পর্যায় - ২ হিসেবে গণনা করতে হবে এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসা দিতে হবে।
শুধু একবার মেপেই সিদ্ধান্ত নয়
রক্তচাপ বিভিন্ন কারণে ওঠানামা করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস, মানসিক চাপ, ব্যায়াম, খাবার, ধূমপান, অ্যালকোহল কিংবা পরিবেশের তাপমাত্রার প্রভাবেও রক্তচাপ বদলে যায়। তাই একটি মাত্র রিডিং দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
বারবার রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম এলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখুন
রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করা মানে শুধু একটি সংখ্যা জানা নয়, বরং হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতাসহ নানা গুরুতর রোগের ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করা। তাই পরিবারের সবার, বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত

