মঙ্গলবার, ১১-ডিসেম্বর-২০১৮ ইং | রাত : ০২:২৮:০২ | আর্কাইভ

লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় কারাবন্দি জামায়াত নেতা শামসুল ইসলামের পক্ষে গণজোয়ার

তারিখ: ২০১৮-১১-২৮ ০৬:২৩:০০ | ক্যাটেগরী: সংসদ নির্বাচন-২০১৯ | পঠিত: ১১ বার

লোহাগাড়া উপজেলা ও সাতকানিয়ার উপজেলা (আংশিক) নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-১৫। স্বাধীনতার পর মাত্র একবারই এ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বিজয়ের মুখ দেখে। তাও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে। সাংবিধানিকভাবে এটাকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বলা হলেও দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ মনে করে।

এই আসনে এক নেতা দুইবার মনোনয়ন পাবার ইতিহাস না থাকলেও সেই রেকর্ড ভেঙে এবারও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান এমপি প্রফেসর ড. আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী। পক্ষান্তরে ২০ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাসের রেকর্ড ব্রেক করে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম। নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবু রেজা নদভী ইতোমধ্যে শো-ডাউনসহ নির্বাচনী মিছিল মিটিং শুরু করলেও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা শামশুল ইসলাম বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন।


 
বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নি অফিসারের কাছে মাওলানা শামসুল ইসলামের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মোহাম্মদ ইছহাক।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিল জেলা আমীর জাফর সাদেক নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এই আসনে মাওলানা শামসুল ইসলামকে প্রার্থী করা হয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি আমাদের হাতে পৌঁছেছে। এলডিপি, বিএনপিসহ জোটভুক্ত সব দলের স্থানীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। অচিরেই সবাই ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে মাঠে নামবেন বলেও জানান তিনি।

জামায়াতের দুর্গ বা ভোটব্যাংক খ্যাত এ আসনে দুইটা উপজেলার সব উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জামায়াত সমর্থিত। বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগের জন্য গোপালগঞ্জ, বিএনপির জন্য বগুড়া, জাতীয় পার্টির জন্য রংপুর ও জামায়াতের জন্য সাতকানিয়া-লোহাগাড়া রিজার্ভ আসন।

সম্প্রতি মনোনয়নযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে নৌকার সমর্থন পেয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য ড. নদভী চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে বিশাল বাড়িবহর নিয়ে পুরো নির্বাচনী এলাকার ঘুরে দেখেন। সেই শো-ডাউনে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সেক্রেটারি কাউকে দেখা যায়নি। তাঁরা সবাই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলামের অনুসারি বলে পরিচিত। তবে বুধবার মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার সময় ভেদাভেদ ভুলে সব নেতাকে একসাথে দেখা যায়।

ড. নদভী নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের জয়যাত্রায় আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার মানুষ আমার সাথে আছে। নেত্রী আমার উপর আস্থা রেখেছেন বলেই আমি আবারো মনোনয়ন পেয়েছি। আসন্ন নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হলে আমি এলাকার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে পারবো।

লোহাগাড়া উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলে এলাহি আরজু নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় গত পাঁচ বছরের মতো উন্নয়ন স্বাধীনতার পর আর হয়নি। আমরা মনে করি উন্নয়নের দিক চিন্তা করে ভোটাররা নৌকা মার্কাকে আবারো বিজয়ী করবেন।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক নাজমুল মোস্তফা আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমি বিএনপি অথবা ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন পাবার লক্ষে অনেক কাজ করেছি। তবে দেশনায়ক তারেক রহমানের পক্ষ থেকে যাকে মনোনয়ন দিয়েছে বিনা বাক্য ব্যয়ে আমরা তার হয়ে নির্বাচনে কাজ করে যাবো। এ লড়াইয়ে জিততে হবে।’

এদিকে আওয়ামী লীগ আমলে এলাকার সাধারণ মানুষ নানাভাবে মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এ আসনে জামায়াতের জনপ্রিয়তা যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করেন সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল ফয়েজ। তিনি নিজেও একাধিকবার কারাভোগ করেছেন।

পুলিশি হয়রানী, মিথ্যা মামলা, অন্যায় অবিচার থেকে বাঁচতে লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার সকল ইসলামী ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক হয়ে মাওলানা শামসুল ইসলামকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।

লোহাগাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান জানান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা শামসুল ইসলামের পক্ষে ইতিমধ্যে নির্বাচনী কমিটিও করা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। এবারের নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সমাজের সকল স্তরের নাগরিকের সমন্বয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে বিপুল ভোটে মাওলানা শামসুল ইসলাম জিতবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সাতকানিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহীম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা শামসুল ইসলামকে লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার জনগণ ২০০৮ সালের মতো আবারও বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন বলে আমরা আশাবাদি। ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী জনতার দুর্গ ও পীর আওলিয়ার আবাসভূমিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বকেই বিজয়ের মুকুট পরাবে জনগণ ইনশাআল্লাহ।

লোহাগাড়ার পুটিবিলা ইউপি সদস্য ও এলডিপি নেতা মোহাম্মদ পেয়ার বলেন, ২০ দলীয় জোটপ্রার্থী মাওলানা শামসুল ইসলামের পক্ষে আমরা ঐক্যবদ্ধ। ইনশাআল্লাহ ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত।

সূত্র বলছে, ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। সেবার তিনি জামায়াত প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এসময় ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী প্রকাশ মোস্তাফিজ মিয়া।

১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আর এ আসনে মনোনয়ন পান নি। সেসময় নৌকার টিকেট পান ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী। সেবার বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে যান তৎকালীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রম । 

২০০০ সালে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় পার্টির একাংশ মিলে চারদলীয় জোট গঠন করে। তারা জোটবদ্ধভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০০১ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৪ তথা লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনে নতুন সংকট দেখা দেয়। বিএনপির কর্নেল অলি ও জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী দু’জনই চারদলীয় জোটের প্রার্থীতা চেয়ে বসেন।

একপর্যায়ে জোটের হাইকমান্ড দুইজনকেই ভোটের মাঠে ছেড়ে দেয় এবং যিনি জিতে আসবেন তাকে গ্রহণ করে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। সেবার নৌকার মাঝি ছিলেন প্রয়াত শিল্পপতি আলহাজ্ব জাফর আহমদ চৌধুরী । তিনি সেসময় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কো-চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির কর্নেল অলি ও আওয়ামী লীগের জাফর আহমদ চৌধুরীকে ধরাশায়ী করে বিজয়ের মুকুট গলায় পরে নেন শাহজাহান চৌধুরী।

২০০৭ সালে ১/১১’র সরকার ক্ষমতায় এসে সবকিছু তছনছ করে দেয়। দেশের দুইপ্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া গ্রেফতার হন। ২ বছর স্থায়ী হয় সেই সরকার। পরে ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দাড়িপাল্লার প্রার্থী হন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের আমীর ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম। নৌকার প্রার্থীতা পান চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট একেএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অবশ্য সেবারও কর্নেল (অব:) অলি আহমদ নির্বাচন করেন। তবে ধানের শীষ নিয়ে নয়, ছাতা মার্কা নিয়ে। তার আগেই বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন তিনি।

কর্নেল অলি ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দুজনই জামায়াতের শামশুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে এ আসনে সবচেয়ে বেশী ভোট পেয়ে রেকর্ড গড়েন মাওলানা শামশুল ইসলাম। সেসময় সারাদেশে জামায়াতের পাওয়া মাত্র দুটি আসনের মধ্যে এটি একটি।

তারিখ সিলেক্ট করে খুজুন