বৃহঃবার, ২০-জুন-২০১৯ ইং | বিকাল : ০৫:০০:০৫ | আর্কাইভ

যাত্রী ঢাকায়, ট্রেন রংপুরে

তারিখ: ২০১৯-০৬-০১ ০২:৪০:৫৩ | ক্যাটেগরী: জাতীয় | পঠিত: ৩১ বার

রংপুরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সাথে ঈদ করবেন লোকমান আলী। ঢাকায় থাকেন সেগুন বাগিচায়। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। পহেলা জুন (শনিবার) যাত্রার তারিখের ‘রংপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের অগ্রিম টিকিটও কেটেছিলেন আগে ভাগেই। টিকিট কাটতে ধকলও কম যায়নি। ২৩ মে সেহরী খেয়ে এসে স্ত্রী সন্তানদের জন্য চারটি এসি সিটের অগ্রিম টিকিট কেটেছিলেন তিনি। শনিবার (১ জুন) নির্ধারিত ট্রেনে তাদের যাত্রার তারিখ ছিল সকাল ৯ টায়।

লোকমানের মতো অনেক যাত্রী সকাল থেকেই রংপুরের যাওয়ার জন্য কমলাপুরে অপেক্ষায় আছেন। সবারই টিকিট হাতে। ট্রেন রংপুর এক্সপ্রেস। জানা গেলো, শনিবার সকালে ঢাকার কমলাপুরে ট্রেনের জন্য যখন এই হাজারো যাত্রী অপেক্ষা করছেন ঠিক সেই মুহুর্তে তাদের নির্ধারিত ট্রেন ‘রংপুর এক্সপ্রেস’ রংপুরেই রয়েছে। এই ট্রেন ঢাকায় আসবে একদিন পরে রোববার । তবে পরে অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থায় যাত্রীদের গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।


 
নির্ধারিত ট্রেনে বাড়ি যাওয়ার জন্য ভোরেই কমলাপুরে চলে এসেছেন লোকমান আলী। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট তার পকেটে। অনেকটা নিশ্চিন্ত মনেই কমলাপুরে সবাইকে নিয়ে এসেছেন তিনি। কিন্তু এসে জানতে পারলেন ট্রেনের এখানো কোনো খোঁজ নেই। শুধু লোকমানের পরিবার নয়, রংপুর অভিমুখী এই ট্রেনের যত যাত্রী আছেন সবাই অধির অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু কেউই ট্রেনের কোন খোঁজ দিতে পারছেন না। পরে জানা গেলো ঢাকায় কমলাপুরে হাজারো যাত্রী যে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন সেই ‘রংপুর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি তখনো রংপুরেই রয়েছে। এক কান দু’কান করে ঘটনা যখন চাউর হলো তখন শুরু হলো বিশৃংখলা, ঘট্টগোল। অনেকে মারমুখী আচরণও শুরু করলো রেলের কর্মকর্তাদের সাথে।

এদিকে ট্রেনের এই বিলম্বের কথা আগেই জানতে পেরে মেরামতের অপেক্ষায় রাখা অন্যান্য কয়েকটি ট্রেনের বগি একত্রে সংযোজন করে তৈরি করা হলো বিকল্প ট্রেন। রেলওয়ের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রেক’। এই রেক ট্রেনে করেই রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীদের বাড়ি পৌঁছানোর আপাদত একটি সুরাহা হলো বলে মনে করা হলেও বিপত্তি ঘটলো অন্য যায়গায়। কেননা এই রেকে তো আর এসি কোন কেবিন বা সিট নেই। তাহলে লোকমান সাহেবদের মতো যারা এসি সিট বা কেবিনের টিকিট কিনেছেন তারা কিভাবে যাবেন ?

সকাল সাড়ে আটটা। কমলাপুরের পূর্ব দিকের প্লাটফর্মে তখন চলছিল কয়েকটি বগি বা রেক সংযোজনের কাজ। কমলাপুর রেলওয়ের কর্মকর্তারা তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এসি সিটের যাত্রীদের শান্তনা দেয়ার জন্য তাদেরকে দিলেন প্রথম শ্রেনীর চেয়ার সিট। এসি সিটের জন্য প্রদেয় টাকার বাকি টাকা ফেরত দিতে মাইকে ঘোষনা দিয়ে যাত্রীদের আহবান জানালেন। লোকমান আলীর এক হাতে দুটি ব্যাগ অন্যহাতে সাত বছরের কন্যা লামিয়া। স্ত্রীর দুই হাতেও দুটি ব্যাগ। এরই মধ্যে টাকা ফেরতে ঘোষনা আসায় বিপাকে পরেছেন লোকমান। চারদিকেই ঠেলাঠেলি। এই ভিড়ের মধ্যেই প্লাটফর্মের বাইরের দিকে স্ত্রী সন্তানদের বসিয়ে রেখে টাকার জন্য লাইনে দাঁড়ালেন। কিন্তু এটা কোন লাইন নয়। এ যেন শত শত লোকের ঠেলাঠেলির প্রতিযোগিতা। ভিড়ের মধ্যেই মিনিট দশেক পরে লোকমান আলী নিজেকে আবিস্কার করলেন জটলার অনেক বাইরে। হাতে যে ছোট্ট ব্যাগটি ছিল সেটিও কিছু পরে জলটার বাইরে কুড়িয়ে পেয়ে নিজেকে অনেকের চেয়ে সৌভাগ্যবান মনে করলেন।


 
সকাল ৯ টার পরে জানানো হলো রংপুরগামী বিকল্প ট্রেনটি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। এবার কার আগে কে ট্রেনে উঠবেন তার প্রতিযোগিতা শুরু হলো। এবার এই প্রতিযোগিতায় স্ত্রী সন্তান দিয়ে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকলেন লোকমান আলী। কারণ এখানে প্রতিযোগিতা করতে গেলে পাছে না আবার স্ত্রী সন্তানদেরই হারাতে হয়। তাই সবার পরেই ট্রেনে উঠার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তবে বিপত্তি এবার অন্য জায়গায়। সবার পরে ট্রেনে উঠার পরে দেখলেন নিজেদের চারটি সিটই দখল করেছেন এয়ারপোর্টগামী চার যাত্রী। অবশ্য টিকিট দেখানোর পর সিট চারটি ছেড়ে দিয়েছেন তারা। পরে সকাল ৯ টার ট্রেন রংপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো সকাল ১০ টারও কিছু পরে। লোকমানের পরিবার কিছুক্ষণ আগেও বাড়ি ফেরার চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এখন যেন কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেলেন।

কমলাপুর রেলের ষ্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ আমিনুল হক এই প্রতিবেদককে জানালেন, রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি রংপুর থেকে ফেরত আসতে বিলম্ব হওয়াতে শনিবার সকালে আমরা অন্যান্য ট্রেনের ১৮ বগি একত্রে সংযোজন করে রেক ট্রেন বা বিকল্প ট্রেনের এর ব্যবস্থা করেছি। এই রেক ট্রেনেই রংপুরগামী যাত্রীদের তুলে দিয়েছি । তবে রেক ট্রেনে কোন এসি সিট বা কেবিন দিতে পারি নাই। তাই ওই সিটের যাত্রীদের প্রথম শ্রেনির সিট দিয়ে বাকি টাকা ফেরত দিয়েছি। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি রোববার সকালে কমলাপুরে এসে যথারীতি যাত্রী নিয়ে আবার রংপুরে যাবে।

তারিখ সিলেক্ট করে খুজুন