Friday, ১৯-জুলাই-২০১৯ ইং | রাত : ০৪:০১:৪৯ | আর্কাইভ

সুগন্ধী খাবারে মৃত্যুঝুঁকি

তারিখ: ২০১৯-০৫-০৭ ০১:২৮:৩৯ | ক্যাটেগরী: লাইফ স্টাইল | পঠিত: ৩৩ বার

খাবারে হরহামেশাই মেশানো হচ্ছে বাহারি রং আর জিভে পানি আসা সুগন্ধী। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে ক্ষতিকর রং আর মন মাতানো এমন সুগন্ধী খাবারে রয়েছে অধিক মাত্রায় মৃত্যুঝুঁকি। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বিশুদ্ধ খাদ্য চাই-এর  গবেষণায় দেখা গেছে খাবারকে অধিক মাত্রায় মুখরোচক আর সুগন্ধী বাড়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল, যা জনস্বাস্থ্য এমনকি জীবনের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।

 

খাবারে ব্যবহৃত রং আর সুগন্ধীর ক্ষতিকর দিক নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে ‘বিশুদ্ধ খাদ্য চাই’  (ডিমান্ড ফর পিওর ফুড) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।সংগঠনটির গবেষণায় উঠে এসেছে খাবারে হরহামেশাই যে রং ব্যবহৃত হচ্ছে তা মূলত টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বা ডাইংয়ের কাজে ব্যবহার করার রং। এই রং কোনোমতেই খাবার উপযোগী নয়। এছাড়া খাবারে এ্যরোমেটিক ফ্ল্যাভার  হিসেবে যে সুগন্ধী ব্যবহার করা হচ্ছে তা মূলত মানবদেহের বাইরে ব্যবহারের জন্য। অর্থাৎ বডি স্প্রে’র জন্য ব্যবহৃত সুগন্ধীই ব্যবহার হচ্ছে আমাদের খাবারে।

বিশুদ্ধ খাদ্য চাই-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. শাকিল মাহমুদ নয়া দিগন্তকে জানান,  আমরা সময়ে সময়ে জনসচেনতার অংশ হিসেবে মাঠ পর্যায়ে  গিয়ে খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করি। সংগৃহীত নমুনা পরিক্ষা করে দেখা গেছে পোশাক কারখানায় বা সুতায় ব্যবহারের রং খাবারে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এ্যরোমেটিক ফ্ল্যাভার বা বডি স্প্রে’তে ব্যবহৃত সুগন্ধী ব্যবহার করা হয় খাবারে। এসব রং আর সুগন্ধী দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে ক্যান্সার সহ মানবদেহের কিডনিও বিকল হতে পারে। রয়েছে  অধিক মাত্রার মৃত্যু ঝুঁকিও।

রাজধানীর মহাখালীতে একটি অভিজাত খাবার হোটেলে ৭/৮ বছর যাবৎ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন ইকবাল হোসেন। প্রতিদিনের কেনাকাটার দায়িত্বও তার।হোটেলের নাম গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে তিনি জানান,  খাবারের সুগন্ধী বাড়াতে ব্যবহৃত হয় কেওড়া জল। অতিরিক্ত এই কেওড়া জল খাওয়ার ফলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া রং হিসেবে যা ব্যবহার করা হয় তা একেবারেই খাবারের অনুপযোগী। কেননা জর্দা রং হিসেবে হোটেল রেস্তোরাতে খাবারে যে রং ব্যবহার করা হয় তা ডাইং-এর রং। তিনি আরো জানান, ৫০ গ্রাম  আসল জর্দা রং এর দাম হবে তিন থেকে চার হাজার টাকা।  অথচ হোটেল বা রেস্তোরাঁর মালিকরা মাত্র ২০ বা ৩০ টাকায় এক শ’ গ্রাম ডাইং-এর রং কিনে সেই ক্ষতিকর রং খাবারে ব্যবহার করছেন। খাবার মুখরোচক করতে অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট বা মজাদার লবণেরও যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে বলে তিনি জানান।

 

বিএসটিআই’র একটি সূত্র জানায়, খাবারকে অতিরিক্ত সুস্বাদু আর লোভনীয় করতে এখন হরহামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে বাহারী রং আর সুগন্ধী। অথচ মানবদেহের জন্য খাবারে ব্যবহৃত ক্ষতিকর এই রং আর সুগন্ধীতে ভয়ানক ক্ষতির প্রমাণও মিলেছে। বিশেষ করে ফরমালিনের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বিএসটিআই’র প্রচারণার কারণে এ বিষয়ে কমবেশি প্রত্যেক গ্রাহকই অবহিত। রমজান মাসে এসব ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রিত খাবার গ্রহণে হতে পারে মৃত্যুরও  কারণ।

এদিকে খাবারে ভেজাল মিশ্রণরোধে রোজার শুরুর প্রথম দিন থেকেই মাঠে নামছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বেশ কয়েকটি টিমে ভাগ হয়ে মাঠ পর্যায়ে খাবারের ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করবে সংস্থাটি। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’র পরিচালক (এনফোর্সম্যান্ট) ড. সহদেব চন্দ্র সাহা নয়া দিগন্তকে জানান, রোজার শুরুর প্রথম দিন থেকেই আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে কাজ করবে। তবে কবে কোথায় এই অভিযান পরিচালনা করা হবে তা আগেই প্রকাশ করা হবে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, দুই সিটি করপোরেশন, সংশ্লিষ্ট থানা, র‌্যাব, আনসার ও বিজিবি মিলে প্রতিটি টীমের সমন্বয় করা হবে। 

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’র এনফোর্সম্যান্ট বিভাগের আরেক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের অভিযানগুলো মূলত ইফতারির বাজারে বেশি গুরুত্ব দেবে। বিশেষ করে পানি, শরবত, আর নানা প্রকারের জুস পরীক্ষা করা হবে। কোনো প্রকার ভেজাল বা ক্ষতিকর কোন কেমিক্যাল পাওয়া গেলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেবে ভ্রাম্যমান আদালত। তিনি আরো জানান, পুরো রমজানকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করে আমাদের অভিযানগুলো পরিচালনা করবো। মধ্য রমজানের পর থেকে খাদ্য প্রস্তুত স্থাপনাগুলো অভিযান জোরদার করা হবে। খাদ্য প্রস্তুত স্থাপনা বলতে তিনি সেমাই তৈরির কারখানা, বেকারি, নুডলস্ বা রেডিমেট ফুটের কারখানাগুলোতে অভিযানের কথা উল্লেখ করেন। 

অন্যদিকে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রহণ পর্যন্ত  ফলমূলসহ সকল খাদ্য বিষমুক্ত ও নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও পল্লীমা গ্রীণ-সহ ৮টি সংগঠনের নেতারা।নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন পল্লীমা গ্রীণ-এর চেয়ারম্যান মুহম্মদ লুতফর রহমান, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-র সমন্বয়কারী আতিক মোরশেদ, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম (নাসফ)-এর সাধারণ সম্পাদক মো: তৈয়ব আলী, বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলন (বানিপা)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ, পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চ-এর সভাপতি আমির হাসান মাসুদ, পল্লীমা সংসদের সাধারণ সম্পাদক আউয়াল কামরুজ্জামান ফরিদ, আইনের পাঠশালা-এর সভাপতি সুব্রত দাস, পল্লীমা গ্রীণ-এর সাধারণ সম্পাদক সোলাইমান খান রবিন প্রমুখ।

এসব সংগঠনের নেতারা বলেন, বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি বাংলাদেশে বহুল আলোচিত এবং উদ্বিগ্নতার একটি বিষয়। ভোক্তা সাধারণ কোনো খাবারেই নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না এবং স্বস্তি পাচ্ছেন না। ব্যাপক পরিসরে এই খাদ্য ভীতি মানুষকে গ্রাস করেছে। বিশেষ করে রমজান মাসে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিশেষত ইফতারিতে যেসমস্ত খাদ্যপণ্য বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর উৎপাদন, আমদানি, মজুতকরণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চলছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সার কীটনাশক যথেষ্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। অননুমোদিত ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশাকও ব্যবহার করা হচ্ছে। আনারস কলাসহ বিভিন্ন খাদ্যে গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু খাদ্যে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারও করা হচ্ছে। ফল মূল পাকানোর জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ দেশের আভ্যন্তরীণ বাজার স্বল্প দুরত্বের আর প্রচুর চাহিদা থাকায় এখানে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় খাদ্য পাকানোর কোনো দরকার নাই। অপরিপক্ক ফল কিংবা খাদ্যে পুষ্টিমান কম থাকে সুতরাং এভাবে ভোক্তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে। কৃত্তিমভাবে কোন ফল পাকাতে হলে সেটা অবশ্যই সরকারের রিগুলেটরি এজেন্সির মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হতে হবে।

তারা অভিযোগ করেন, কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষিতে কীটনাশক পরিমাণ মতো ব্যবহারের অনুমোদন দিলেও মাঠে কী হচ্ছে, তা যথাযথভাবে নজরদারি করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার যেমন করা হয়, তেমনি কীটনাশক ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর শস্য বা ফল বাজারে নেয়ার কথা থাকলেও সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় না। উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা থাকলেও আদৌও মাঠে গিয়ে কৃষককে সচেতন করে তোলার মতো কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায় না।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’র সূত্রমতে, পেস্টিসাইড অর্ডিনেন্স ১৯৭১ এ নিষিদ্ধ কীটনাশক বিক্রি, বিক্রি বা প্রদর্শনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার  টাকা অর্থদ-, পরবর্তী অপরাধের জন্য ৭৫ হাজার  টাকার কম নয় বা এক লাখ টাকার উর্ধ্বে এবং অর্থদণ্ড প্রদানে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশানোর সাথে জড়িত ও ফরমালিনযুক্ত খাদ্য বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর ২৫-গ ধারায় খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল খাবার বিক্রয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য (সংশোধিত) আইন, ২০০৫ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল খাবার বিক্রয়ের জন্য অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড, বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়  দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তারিখ সিলেক্ট করে খুজুন