মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানটির নাম খেয়েই ক্ষান্ত হননি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। নিজস্ব বলয় গড়ে তুলে খেয়েছেন হাসপাতালের আসবাবপত্র ও সরঞ্জামাদিও। সম্প্রতি গণমাধ্যমের হাতে আসা এক নথি থেকে হাসপাতালটি ঘিরে জাহিদ মালেক চক্রের বেশুমার দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে।
নথির তথ্যমতে, মাত্র ২০০ টাকা দামের নিম্নমানের কম্বল এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য কেনা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা দামের ম্যাট্রেস কেনা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দাম শুধু অস্বাভাবিকই নয়, একে বলা যায় একেবারে ‘পুকুর চুরি করে খাওয়া’। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দামে পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
জানা গেছে, সরকারি অর্থে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মানিকগঞ্জে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। জাহিদ মালেক ওরফে স্বপন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে তিনি নিজ পিতা কর্নেল আব্দুল মালেকের নামে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটির নাম দেন ‘কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’। গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৩ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ফের মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নাম রাখা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘শীতার্ত অসহায়-গরিব মানুষের জন্য অনেকেই কম টাকায় কম্বল কিনে বিনামূল্যে বিতরণ করেন। সাধারণ অর্থে এসব কম্বল ‘দানের কম্বল’ হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে ওই ধরনের কম্বলের খুচরা মূল্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। পাইকারি দর আরও কম। এসব দানের কম্বল চড়া দামে কিনেছে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। টানা তিন অর্থবছর ধরে রোগীদের ব্যবহারের এ পণ্যটি অস্বাভাবিক দাম দিয়ে কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি। কেবল কম্বলই নয়, গত তিন অর্থবছরের কেনাকাটার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সব ধরনের সরঞ্জাম ও রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দাম নেওয়া হয়েছে। তথ্য বলছে, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করতে। আর এক্ষেত্রে তারা ইচ্ছামতো দাম বসিয়ে দিত। এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় হাসপাতালেরই একটি চক্র সব ধরনের সহযোগিতা করত। যারা স্থানীয়ভাবে ‘মন্ত্রীর লোক’ হিসেবে পরিচিতি ছিলেন।
২০২১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের কেনাকাটার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাসপাতালের জন্যে ব্যবহৃত ঝাড়ু কেনার ক্ষেত্রেও বাড়তি টাকা নিয়েছে ঠিকাদার চক্রটি। কেবল তাই নয়, বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল সরঞ্জাম, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এমনকি নানা ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্যে কেনার ক্ষেত্রেও সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের প্যারাগন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল পণ্য সরবরাহ করে। এর মধ্যে প্রচলিত বাজারে প্রমাণ সাইজের ব্লাড লাইনের খুচরা দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য প্রতিটি ব্লাড লাইন কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা দরে। খুচরা দাম হিসাব করে ১২শ ব্লাড লাইন কিনতে ব্যয় হওয়ার কথা ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বিল পরিশোধ করেছে ৪১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে প্রায় ৩৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা সরকারি অর্থ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
একইভাবে চীনের তৈরি হোমোডায়ালাইজার প্রতিটির বাজারে খুচরা মূল্যে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এ পণ্যটি কিনেছে ৩ হাজার ৭৪৩ টাকা দরে। আর ৩৩৯টি পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৭ টাকা। একইভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেনা নানা পণ্যের বাজার যাচাই করে দেখা গেছে, প্রলোলেন সফট মেসের দাম খুচরাবাজারে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু এটি ঠিকাদাররা বিল দেখিয়েছেন ৫ হাজার ৫২৫ টাকা, যা বাজারে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চাইতে প্রায় ১১ গুণ বেশি। হাসপাতালটি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৫০০ পিস প্রলোলেন সফট মেস ক্রয়ে ব্যয় দেখিয়ে ২৭ লাখ ৬২ হাজার ৯২৫ টাকা। অথচ এর দাম হওয়া উচিত ছিল সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই একটি মাত্র পণ্যে ২৫ লাখ টাকারও বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। অন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম স্কিন স্টাপলারের বাজারমূল্যে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। কিন্তু প্রায় আড়াই গুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে প্রতিটি কেনা হয়েছে ১ হাজার ১৮২ টাকা দরে। এক হাজার পিস স্কিন স্টাপলার ক্রয় করতে মোট খরচ হয়েছে ১১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এ পণ্যটিতে কমপক্ষে সাড়ে ৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
নথির তথ্যমতে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মেসার্স বনানী মেডিকেল স্টোর নামের একটি অখ্যাত ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কম্বল, চাদর ও ম্যাট্রেস ফোম সরবরাহ করে। তারা একেকটি কম্বলের দাম নিয়েছে ২ হাজার ৩৯৫ টাকা। এক হাজার পিস কম্বল ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ১৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এক হাজার পিস কম্বল ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা। একইভাবে বিছানার চাদরের দাম নেওয়া হয়েছে ৫৯৮ টাকা। যদিও বাজারে ওই একই মানের বিছানার চাদরের দাম আড়াইশ থেকে ৩০০ টাকা। একইভাবে একেকটি ম্যাট্রেস ফোমের দাম ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৮০ টাকা। তবে এর বাজারমূল্যে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে হাসপাতালটির জন্য কম্বল, বেবি ম্যাট্রেস (ফোম) এবং ম্যাট্রেস বেড ক্রয় করে মেসার্স হারামাইন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নথিতে দেখা যায়, একেকটি কম্বলের দাম ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪১০ টাকা। সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় ওই কম্বল। তার নমুনা নিয়ে রাজধানীর বঙ্গবাজার ও নিউমার্কেটসহ একাধিক বাজারে যোগাযোগ করলে ব্যবসায়ীরা জানান, ওই কম্বলের পাইকারি দর সর্বোচ্চ ২০০ থেকে আড়াইশ টাকা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই কম্বল সরবরাহ করেছে ২ হাজার ৪১০ টাকা দরে। ৭৪১ পিস কম্বল সরবরাহে দাম নেওয়া হয়েছে ১৪ লাখ ৪৯০ টাকা। শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কম্বল সরবরাহ করে বাড়তি বিল নেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা।
তথ্যমতে, একইভাবে বেবি ম্যাট্রেস (ফোম) দাম ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯০০ টাকা। যদিও এসব বেবি ম্যাট্রেসের বাজার দর ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে। ম্যাট্রেস বেডের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৯০০ টাকা। যার বাজার দর প্রতিটি ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। একই অর্থবছরে প্লাস্টিক ড্যানিস (৩৬ গুণ ৪৮) ক্রয় করা হয়েছে প্রতিটি ১৩ হাজার ৫০০ টাকায়। তবে এর বাজারমূল্যে রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২০০ টাকা।
শুধু অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক দাম নেওয়া হয়নি, বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক দাম নেওয়া হয়েছে। অ্যারোসলের মতো প্রচলিত পণ্যের ৪০০ মিলির প্রতিটির দাম খুচরা বাজারে ৪০০ টাকার কম। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই পণ্য কেনে ৭১৫ টাকা দরে। ২০০ মিলি এয়ারফ্রেশনারের বাজারদর সর্বোচ্চ আড়াইশ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে ৪৮৫ টাকা দরে। এমনকি প্রতিটি ঝাড়ু কেনা হয়েছে ১৬০ টাকা দরে। যার খুচরা মূল্যে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। নথি বলছে, গত তিনটি অর্থবছরেই এমন অতিরিক্ত দামে এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়।
২০২৩ সালে মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে এসিডিক হোমোডায়ালাইসিস ফ্লুড (এ-পার্ট)। যার বাজারমূল্যে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। এ ছাড়া ইউরিন কালেকটিং ব্যাগ, ক্যাথেটর, ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহে অস্বাভাবিক দাম ধরা হয়েছে। একই বছরে মেসার্স হারমাইন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৪০ টাকার সফট রোল সরবরাহ করে ৮১ টাকায়। ১০০ টাকার ২ ইঞ্চির মাইক্রো ফোর সরবরাহ করে ৩৫৮ টাকায়। ৬০ টাকার এক ইঞ্চি মাইক্রোফোর সরবরাহ করে ১৮৮ টাকায়। একই বছরে মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স নামের প্রতিষ্ঠান আইভি ক্যানোলা (১৮, ২০ এবং ২২) সরবরাহ করে প্রতিটি ৩৮ টাকায়। যদিও এর বাজার খুচরা দাম ১৮ টাকা।
২০২৩ সালে ডেঙ্গু শনাক্তের সাড়ে চার হাজার ডিভাইস কেনা হয়। বর্তমানে বাজারে এসব ডিভাইসের খুচরা দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা হলেও মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এই ডিভাইস কিনেছে ২৭৩ টাকা দরে। একইভাবে এসিডিক হেমোডায়ালাইসিস ফ্লুইড ১০ লিটারের ক্যান প্রতিটির দাম ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এগুলো কিনেছে ১ হাজার ৭৩৫ টাকা দরে। এক্স-রে ফিল্ম কেনার ক্ষেত্রেও লুটপাটের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফুজি এক্স-রে ফিল্ম ১৪-১৭ ইঞ্চি, ১১-১৪ ইঞ্চি এবং ৮-১০ ইঞ্চির ফিল্মের বক্সের (১০০ সেটের বক্স) সরবরাহ করা হয়েছে যথাক্রমে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা ৩৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং ২৭ হাজার ৯০০ টাকায়। যদিও এগুলোর বাজারদর যথাক্রমে ১৭ হাজার, ১১ হাজার ও ১১ হাজার টাকা। এই এক্স-রে ফিল্ম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে নথি থেকে জানা গেছে।
হাসপাতালের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ঠিকাদারি পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স হিসেবে কেটে রাখা হয়। এর বাইরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাভ হিসেবে ধরা হয় ১৫ শতাংশ। কিন্তু সাবেক কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক দরে পণ্য ক্রয় করেছে। ভ্যাট-ট্যাক্স এবং লাভের অংশ বাদ দিলেও ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি দাম ধরা হয়েছে, যা ভয়াবহ দুর্নীতি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালটির তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. আরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘এমন অস্বাভাবিক দাম হওয়ার সুযোগ নাই। আমার একক সিদ্ধান্তে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ারও সুযোগ নেই। ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে টেন্ডার কমিটি রয়েছে। এরপর ইভ্যালুয়েশন কমিটির সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে সার্ভে কমিটি। এরা ঠিকঠাক কাজ বুঝে পেলেই রিপোর্ট দেয়।’
একই বিষয়ে হাসপাতালটির বর্তমান পরিচালক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এ হাসপাতালে কী কাজ হয়েছে, কেনাকাটায় কী অনিয়ম হয়েছে, তা আমার জানা নেই। এসব নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে এখন আমি দায়িত্বে রয়েছি। সেক্ষেত্রে বর্তমানের কোনো বিষয় থাকলে আমি মন্তব্য করতে পারি।’
তথ্য সূত্র:কালবেলা